বিচার ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফেরাতে চাই: আইনমন্ত্রী

সময়: 10:13 am - October 29, 2026 |

দেশে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন; দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিচারকদের সক্রিয় ভূমিকার তাগিদ

জিয়াউল হক টুটুল:

বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, আদালতে গিয়ে যেন মানুষ হয়রানির শিকার না হন এবং দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে দ্রুত ন্যায়বিচার পান, সে পরিবেশ তৈরি করতে চায় সরকার। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের সম্মেলনকক্ষে দুটি ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থা, ভরসা ও বিশ্বাস রয়েছে, সেটিকে আরও দৃঢ় ও উন্নত করতে চায় সরকার। মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৪৬ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রায় ২ হাজার ৩০০ বিচারকের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি বিচারকদের ওপর অনেক সময় অমানবিক চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে মামলার চাপ বেশি। তিনি বলেন, যেসব জেলায় মামলার চাপ বেশি, সেখানে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে আগ্রহী ও সক্রিয় বিচারকদের পদায়নের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। বিচারকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে আরও সক্রিয় হতে হবে। কোনো কোনো আদালতে সীমিত সময় বিচারকাজ পরিচালনার অভিযোগের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার প্রার্থীদের স্বার্থে আদালতের কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করা জরুরি। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা শুধু চাকরি করার মানসিকতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগের সামনে আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের কণ্ঠ নকল, পরিচয় অনুকরণ এবং বিভিন্ন তথ্য তৈরি করার সক্ষমতা বাড়ছে। ফলে সাক্ষ্য-জবানবন্দি গ্রহণ ও রায় লেখার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিচারকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচারকদের ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও দক্ষ ও সচেতন হতে হবে। আইনমন্ত্রী বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণ বিচারকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগানোর প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। আদালতে আসামিদের হাজিরা এবং বিচারিক কার্যক্রম ডিজিটাল করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন, নিরাপত্তা ও জনবলের প্রয়োজন হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয় হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে দীর্ঘ সময় এ কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। এ প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের চিন্তা করছে সরকার বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কিছু আসামির ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালুর কথাও উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ই-বেইলবন্ড চালুর সুফল জনগণ পেতে শুরু করেছে। বিচারিক কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ ডিজিটাল করা গেলে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে। এ জন্য ই-জুডিশিয়ারি কার্যক্রমের আওতায় বিচারিক প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মামলার চাপ কমাতে মামলা দায়েরের আগেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রি-কেস মেডিয়েশন বা মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এ উদ্যোগে জাপানের সহযোগী সংস্থা জাইকা, জার্মানির জিআইজেড এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সহযোগিতা করছে। আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০টি জেলায় এ কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং সাফল্যের হার ৬২ শতাংশের বেশি। ১১টি আইনের আওতায় মামলা দায়েরের আগে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মামলা দায়েরের প্রবাহ কমানো এবং বিচারাধীন মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে বিচারকদের আরও সময় ও মনোযোগ দেওয়া গেলে এক বছরের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে আইনমন্ত্রী বলেন, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আইন তৈরির আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুমসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংশোধন নিয়েও জনপরামর্শ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সংবিধান সংশোধন নিয়েও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবার, শহীদ পরিবারের সদস্য, ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সদস্য এবং সাংবাদিকদের মতামত নেওয়ার কথা তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের যৌক্তিক সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে সংবিধান মেনেই সামনে এগোনো যায়। বিচার অঙ্গনে কোনো অসংগতি বা উন্নতির সুযোগ চোখে পড়লে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নে গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণে প্রস্তুত। অনুষ্ঠানে আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর