পানির সংকট বাড়ছে, নিরাপদ পানির অভাবে ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

সময়: 8:59 am - November 8, 2026 |

বিশুদ্ধ পানির উৎস থাকলেও দূষণ, আর্সেনিক ও লবণাক্ততায় বাড়ছে ঝুঁকি; নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ

নিজাম উদ্দিন:

পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি, শিল্প, খাদ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই পানির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ বাংলাদেশে পানির উৎসের বিস্তৃতি থাকলেও নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পানির উৎসে জীবাণুর উপস্থিতি, আর্সেনিক দূষণ, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বাংলাদেশে মৌলিক পানির উৎস ব্যবহারের হার বেশি হলেও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মৌলিক পানির উৎস ব্যবহার করে। তবে নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানীয় পানির সুবিধা রয়েছে মাত্র প্রায় ৩৯ শতাংশ মানুষের। অর্থাৎ পানির উৎসের নাগাল থাকলেও বড় একটি জনগোষ্ঠীর জন্য পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পানির মান নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্যও উঠে এসেছে জরিপে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের পর্যায়ে পান করা পানির প্রায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ নমুনায় ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রায় ১৫ শতাংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে বেশি মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। এসব দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

দূষিত পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি:

বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা দূষিত পানির কারণে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। পানি সংগ্রহের পর পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও জীবাণু ছড়াতে পারে। ফলে শুধু পানির উৎস নিরাপদ হলেই চলবে না, ঘরে পৌঁছানো এবং সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়ায় পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি।

অঞ্চলভেদে পানির সংকটের ভিন্ন চিত্র:

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির সংকটের ধরন এক নয়। উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মিঠাপানির উৎসে প্রবেশ করায় সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মৌসুমি পানিসংকট উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আর্সেনিক দূষণও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু নতুন পানির উৎস তৈরি নয়, বিদ্যমান উৎসগুলোর পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি। বিশেষ করে নলকূপের পানিতে আর্সেনিক ও জীবাণুর উপস্থিতি পরীক্ষা এবং দূষিত উৎস চিহ্নিত করে বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় পানি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, পানির উৎস সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য যাতে নদী, খাল ও জলাশয়ে মিশে পানির উৎস দূষিত করতে না পারে, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা শুধু পানি সরবরাহকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়; সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পানির উৎসের সুরক্ষা, নিয়মিত মান পরীক্ষা, দূষণ রোধ এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। বিশুদ্ধ পানি মানুষের মৌলিক চাহিদা ও জনস্বাস্থ্যের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই পানির উৎস থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই পানি মানুষের জন্য নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর