স্বাধীনতার ঘোষক থেকে আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার: শহীদ জিয়ার আদর্শ ও এক অবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক ধারা

সময়: 2:28 pm - May 30, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রগঠন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং জননেতা তারেক রহমান—এই তিনটি নাম একটি অবিচ্ছেদ্য, গতিশীল ও কালজয়ী ধারার প্রতীক। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে যে কালজয়ী দর্শনের সূচনা করেছিলেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে তা জনগণের হৃদয়ে প্রোথিত করেন। আর নানামুখী চক্রান্ত, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও দীর্ঘ নির্বাসনের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে তারেক রহমান ২০২৬ সালের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপিকে জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটসহ রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে এসে সেই আদর্শিক ধারাকে একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান: স্বাধীনতার মহান ঘোষক ও আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি জন্ম, প্রারম্ভিক জীবন ও দূরদর্শী মননঃ ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। পিতা মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। অত্যন্ত মেধাবী, সুশৃঙ্খল ও দূরদর্শী এই মানুষটির ডাকনাম ছিল “কমল”। ১৯৫২ সালে মেট্রিকে সাফল্যের পর ১৯৫৩ সালে কাকুলের পাকিস্তান একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে সামরিক জীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তীতে পেশাগত জীবনে তিনি কোয়েটার বিখ্যাত স্টাফ কলেজ থেকে ‘কমান্ড’ কোর্স সম্পন্ন করেন এবং পশ্চিম জার্মানি থেকে উচ্চতর সামরিক কৌশলগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭১: কালুরঘাটের হুংকার ও বীরত্বগাথা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞের মুখে যখন বাঙালি জাতি দিশেহারা, তখন জিয়াউর রহমান প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামে পাকিস্তানি অধিনায়ককে বন্দি করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। ২৭ ও ২৮ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি যে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেন, তা ছিল দিকভ্রান্ত জাতির জন্য এক চরম সঞ্জীবনী সুধা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তা। মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টর, পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টর এবং শেষে গৌরবময় প্রথম সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখ সমরে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। অসামান্য রণনৈপুণ্য ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক “বীর উত্তম”-এ ভূষিত করে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার এই মহান রাষ্ট্রনায়ককে মরণোত্তর “স্বাধীনতা পদক”-এ ভূষিত করে। রাষ্ট্রনায়ক জিয়া: বহুদলীয় গণতন্ত্র ও স্বনির্ভরতার দর্শন ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে এক গণভোটের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: তিনি বাঙালি, আদিবাসী ও সকল ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় গাঁথতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর অনন্য রাজনৈতিক দর্শন প্রবর্তন করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র: একদলীয় বাকশালের অন্ধকার থেকে দেশকে মুক্ত করে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করেন এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)”। অর্থনৈতিক বিপ্লব: খাল খনন কর্মসূচি, সবুজ বিপ্লব, গণশিক্ষা, গার্মেন্টস শিল্পের সূচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে তিনি এক স্বনির্ভর বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেন। সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠা: আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে তাঁর দূরদর্শী চিন্তা থেকেই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর জন্ম হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে এই মহান জননেতা শাহাদাৎ বরণ করেন। আজ তাঁর ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক ক্ষণে সমগ্র জাতি তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় ও শূন্যতায় স্মরণ করছে। বেগম খালেদা জিয়া: “আপসহীন নেত্রী” ও গণতন্ত্রের ফিনিক্স পাখি রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ও রাজপথের অগ্নিপরীক্ষা ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়া ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮১ সালে জিয়ার শাহাদাতের পর দলের চরম অস্তিত্ব সংকটে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী ৯ বছরের দীর্ঘ আপসহীন সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন রাজপথের প্রধান কাণ্ডারি। এই সময়ে সাতবার গৃহবন্দী ও আটক হলেও তিনি স্বৈরাচারের সাথে কোনো আপস করেননি, যা তাঁকে জনগণের হৃদয়ে “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে চিরস্থায়ী আসন দেয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপরিচালনা ও সমাজ সংস্কার প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদ (১৯৯১-১৯৯৬): ১৯৯১ সালের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর আমলেই ঐতিহাসিক সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেন। তৃর্তীয় মেয়াদ (২০০১-২০০৬): ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে তিনি তৃতীয়বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। এই সময়ে যমুনা বহুমুখী সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু) চালু এবং যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন: তাঁর শাসনামলে মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী (পরবর্তীতে সম্প্রসারিত) পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়, যা ছিল দক্ষিণ এিশায় নারী শিক্ষার এক নীরব বিপ্লব। বিশ্বমঞ্চে তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০০৫ সালে তাঁকে বিশ্বের ২৯তম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। পরবর্তী জীবন ও চরম আত্মত্যাগ ২০১৮ সালে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো মামলায় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার প্রতিবেদনেও এই মামলাকে “রাজনৈতিক চক্রান্ত” ও আইনি প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় হিসেবে অভিহিত করা হয়। সমস্ত শারীরিক অসুস্থতা, উন্নত চিকিৎসার অভাব ও দীর্ঘ জুলুম উপেক্ষা করে তিনি আজও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মূল প্রেরণা ও গণতন্ত্রের ফিনিক্স পাখি হয়ে টিকে আছেন। তারেক রহমান: আধুনিক মনন, সাম্য ও নতুন বাংলাদেশের কাণ্ডারি তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতির পুনর্গঠন ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা তারেক রহমান শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার যোগ্য উত্তরসূরি। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে তৃণমূল থেকে তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তিনি কেবল ড্রয়িংরুমের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং সমগ্র বাংলাদেশে ঘুরে ঘুরে ‘তৃণমূল সম্মেলন’ ও চিঠির মাধ্যমে ১৮,০০০-এরও বেশি মাঠপর্যায়ের কর্মীর সাথে সরাসরি যোগাযোগের এক অনন্য গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু করেন। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে দেশনেত্রীর কারাবরণের পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সুদূর লন্ডন থেকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক বিজয় ও ক্ষমতার নতুন দিগন্ত দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, অপপ্রচার, শারীরিক নির্যাতন, নির্বাসন ও চরম political প্রতিকূলতা পেরিয়ে তারেক রহমান ধীরস্থির ও দূরদর্শী কূটনীতির পরিচয় দেন। ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর, তাঁরই সুদক্ষ ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল হিসেবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। (উক্ত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৬৮ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হয়)। এই বিজয় কেবল একটি সাধারণ নির্বাচন ছিল না, এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রায় এবং তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে বিএনপির এক নতুন যুগের সূচনা। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জবাবদিহিতামূলক ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আধুনিক সাম্যের বাংলাদেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেছেন। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও জিয়া > খালেদা > তারেক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের এই ধারা কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক উত্থান নয়, বরং এটি একটি সুদীর্ঘ, পরীক্ষিত এবং রক্তস্নাত ধারাবাহিকতা। [শহীদ জিয়া] [বেগম খালেদা জিয়া] [তারেক রহমান] (ভিত্তি ও স্বপ্নদ্রষ্টা) –> (রক্ষক ও ধারক) –> (আধুনিক রূপকার ও বাস্তবায়নকারী) “শহীদ জিয়া” ছিলেন এই ধারার ‘ভিত্তি ও স্বপ্নদ্রষ্টা’, যিনি রাষ্ট্র ও জাতিকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় দিয়েছিলেন। “বেগম খালেদা জিয়া” ছিলেন এই স্বপ্নের “রক্ষক ও ধারক”, যিনি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের মুখে আপসহীনভাবে এই পতাকাকে সমুন্নত রেখেছেন। “তারেক রহমান” হলেন এই আদর্শের ‘আধুনিক রূপকার ও বাস্তবায়নকারী’, যিনি একবিংশ শতাব্দীর তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রযুক্তি ও মেধার সমন্বয়ে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করছেন। ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতির ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, জিয়াউর রহমান যে স্বাধীন, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন—বেগম খালেদা জিয়ার আত্মত্যাগ এবং তারেক রহমানের ২০২৬ সালের জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা আজ এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করেছে। এই ত্রয়ী নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে সার্বভৌমত্ব, জাতীয়তাবাদ ও জনকল্যাণের এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা।

লেখকঃ প্রফেসর ড. আসিফ মিজান,
ভাইস-চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়,
সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর