জুনজুড়ে ভূমিকম্পের আতঙ্ক, একই সময়ে বারবার কম্পন

সময়: 4:56 am - June 23, 2026 |

মানব কথা:জুন মাসে একের পর এক ভূমিকম্পে কেঁপেছে বাংলাদেশ। উদ্বেগের বিষয় হলো, আলোচিত চারটি ভূমিকম্পই অনুভূত হয়েছে রাতের বেলায়। এর মধ্যে তিনটি ঘটেছে রাত ৯টা ৩০ মিনিটের আশপাশে।সর্বশেষ নরসিংদী কেন্দ্রিক ভূমিকম্পে আবারও কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকা। বহুতল ভবনে বসবাসকারী মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প রাতেই বেশি হয়— এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলেও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় রাতের কম্পন মানুষের মধ্যে তুলনামূলক বেশি ভীতি তৈরি করে। ধারাবাহিক এই কম্পন নতুন করে সামনে এনেছে দেশের ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও নগর নিরাপত্তার প্রশ্ন।জুন মাসে বাংলাদেশে অনুভূত ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সর্বশেষটি আঘাত হানে ২২ জুন রাত ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পন অনুভূত হয়।

আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ভলকানো ডিসকভারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪। সংস্থাটি জানিয়েছে, এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৬ কিলোমিটার গভীরে।অন্যদিকে ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদীর ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।

হঠাৎ এই কম্পনে রাজধানীর বিভিন্ন বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই বাসা থেকে বের হয়ে খোলা জায়গা কিংবা সড়কে অবস্থান নেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।পরিসংখ্যান বলছে, চলতি জুনে আলোচিত চারটি ভূমিকম্পই ঘটেছে রাতের বেলায়। ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর ১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ১৮ জুন রাত ৯টা ২৯ মিনিটে অনুভূত হয় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন। সর্বশেষ ২২ জুন রাত ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে আবারও কেঁপে ওঠে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা।বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ১১ জুন, ১৮ জুন এবং ২২ জুনের ভূমিকম্পগুলো প্রায় একই সময়ে— রাত ৯টা ৩০ মিনিটের কাছাকাছি অনুভূত হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের সঙ্গে দিন বা রাতের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে রাতের নীরব পরিবেশ, অধিকাংশ মানুষের ঘরে অবস্থান এবং উঁচু ভবনে কম্পনের বেশি অনুভূতির কারণে রাতের ভূমিকম্প সাধারণ মানুষের মনে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করে।বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বড় শহরের বহুতল ভবননির্ভর জীবনযাত্রা নগরবাসীকে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, জরুরি প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টি তাই আবারও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। সাম্প্রতিক ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক চাপের স্বাভাবিক মুক্তির অংশ হতে পারে। এগুলোকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলা যাবে না, তবে সতর্কতা অব্যাহত রাখা জরুরি।পরপর কয়েক সপ্তাহে চারবারের মতো ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় অনেকের মনেই প্রশ্ন— দেশ কি বড় কোনো ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে? যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন আশঙ্কার পক্ষে এখনই নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে ছোট ছোট কম্পনগুলো ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।জুনের ধারাবাহিক এই কম্পন অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে— ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখনো বাস্তব, আর সেই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় মুখোমুখি হচ্ছে দেশের নগরবাসী।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর