লক্ষ্মীপুরে মা-তিন মেয়েকে হত্যা: ‘বাঁচাও’ চিৎকার শুনে ছুটে যান প্রতিবেশী, গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত

সময়: 4:56 pm - July 14, 2026 |

মানব কথা:লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে হৃদয়বিদারক এক হত্যাকাণ্ডে মা ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পালানোর সময় স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অভিযুক্ত যুবক। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্তের নাম অন্তর মজুমদার (৩০)।

তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা এবং রায়পুরে ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকারে ছুটে যান প্রতিবেশী: 

প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী জানান, সকালে পাশের বাসা থেকে হঠাৎ ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুনে তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে যান। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গৃহকর্ত্রী শাহিনুর বেগমকে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া পাননি। কিছুক্ষণ পর কান্নার শব্দ থেমে গেলে চারদিকে নেমে আসে অস্বাভাবিক নীরবতা। তিনি জানান, পরে ঘরের ভেতরে একজনকে চলাফেরা করতে দেখে প্রথমে মনে করেছিলেন, শাহিনুরের ছেলে সিফাত বাসায় ফিরেছে। কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে সন্দেহ হয়। এরপর জানালার কাছে গিয়ে এক অচেনা যুবককে প্যান্ট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। জিজ্ঞাসা করলে ওই ব্যক্তি নিজেকে পাইপলাইন মেরামতের কর্মী বলে পরিচয় দেন। আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় আফরোজা দ্রুত বাড়ির প্রধান ফটক বাইরে থেকে আটকে দিয়ে আশপাশের লোকজনকে খবর দেন।

ঘরে মিলল তিন মরদেহ, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় আরেক মেয়ে :

প্রতিবেশীরা ঘরে ঢুকে শাহিনুর বেগম, বড় মেয়ে সায়মা ও ছোট মেয়ে শিফাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত দেখতে পান। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মেজ মেয়ে ইকরাকে। প্রথমে তাকে রায়পুর সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছিল। তবে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এলাকায় পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়।

পালাতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত:

ঘটনার পর অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালানোর চেষ্টা করে ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন। স্থানীয়রা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর আগে এলাকায় তাকে খুব বেশি দেখা যায়নি। তবে কেউ কেউ জানিয়েছেন, একসময় তিনি ওই ভবনের ভাড়াটিয়া ছিলেন।

অভাবের সংসারে একের পর এক স্বপ্নের মৃত্যু:

নিহত শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল হোসেন ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর থেকে সন্তানদের নিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যেও জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবারের সন্তানরা সবাই মেধাবী ছিলেন। বড় মেয়ে সায়মা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছিলেন। ছেলে সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং চাকরি করে পরিবারের দায়িত্বও পালন করতেন। মেজ মেয়ে ইকরা লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে শিফা মার্চেন্টস একাডেমিতে পড়াশোনা করত।

পুলিশের বক্তব্য :

রায়পুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জামাল হোসেন জানান, সকাল ৯টার দিকে হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় স্থানীয়রা অন্তর মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে মারা যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার ইটপাটকেলে পুলিশের সাত সদস্য আহত হন। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানান, ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদকাসক্ত ছিলেন। তবে তদন্ত শেষে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর