সুস্থ মানুষকে ‘ক্যানসার রোগী’ দেখিয়ে সরকারি অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ, সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক মোবারককে ঘিরে তদন্তের দাবি

সময়: 4:29 pm - July 14, 2026 |

মানব কথা:পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে সুস্থ ব্যক্তিদের নামে ভুয়া চিকিৎসাপত্র তৈরি করে সরকারের বিশেষ কল্যাণ তহবিলের অনুদানের টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সরকারি অনুদানের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।এ ঘটনায় গত ২০ জুন রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন পাবনার বেড়া উপজেলার জাতসাখিনী ইউনিয়নের রানীগ্রামের বাসিন্দা মো. শাকিল খান।

সুস্থ স্ত্রীকে ক্যানসার রোগী বানিয়ে অনুদান উত্তোলনের অভিযোগ:

লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালে অভিযুক্ত মোবারক হোসেন প্রতিবেশী শাকিল খানের স্ত্রী মোছা. লিপি খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করেন। পরে সম্প্রতি নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে গিয়ে শাকিল জানতে পারেন, তার স্ত্রীর নামে আগেই রূপালী ব্যাংকের নগরবাড়ী ঘাট শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়েছে। ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ওই হিসাবে সরকারি অনুদান হিসেবে ৫০ হাজার টাকা জমা হয় এবং দুই দিন পর পাবনা কর্পোরেট শাখা থেকে পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে সমাজসেবা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লিপি খাতুনকে কাগজপত্রে “ক্যানসার আক্রান্ত জটিল রোগী” দেখিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ তহবিল থেকে অনুদান অনুমোদন করানো হয়েছিল। অথচ লিপি খাতুন কখনো ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন না বলে দাবি করেছে তার পরিবার। ভুক্তভোগী শাকিল খান বলেন, “আমি নিরক্ষর মানুষ। পরিচিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে আমার স্ত্রীকে কাগজে-কলমে ক্যানসার রোগী বানিয়ে সরকারি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।”

আরও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ: 

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, মোবারক হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার, কিডনি ও লিভার সিরোসিস রোগীদের সরকারি অনুদান পাইয়ে দেওয়ার নামে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, দরিদ্র ও অসচেতন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভুয়া মেডিকেল সনদ তৈরি, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং পরে সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে।

রানীগ্রামের বাসিন্দা হাসি আক্তার বলেন,
“আমার দেবরের নামে ৫০ হাজার টাকার সরকারি অনুদান তুলে নেওয়া হয়েছে, অথচ সে কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল না। অন্যদিকে আমার স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও আমরা কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি।”একই গ্রামের কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার ক্যানসার আক্রান্ত বাবার অনুদানের চেক ছাড় করতে মোবারক ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিযোগকারী বলেন, পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা সরকারি অনুদান পাইয়ে দেওয়ার নামে বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাৎ করছে।

মোবারকের বক্তব্য:

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহায়ক মোবারক হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,“আমি কোনো অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত নই। কিছু স্থানীয় শত্রু আমার চাকরি ও ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ করছে।” এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে মিলেছে অসঙ্গতির তথ্য: 

ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর গত ২৫ জুন বেড়া উপজেলার তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোতালেব সরকার রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে লিপি খাতুনের নামে সরকারি অনুদানের অর্থ উত্তোলনের নথি সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত মোবারকের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগ এসেছে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিযোগকারী পরিবার নিরক্ষর। তাদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে বেড়ার নগরবাড়ী ঘাট শাখায়, কিন্তু অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে পাবনা কর্পোরেট শাখা থেকে। নথিপত্র যাচাই করে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের বক্তব্য:

পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, “চলতি অর্থবছরে অনুদানের অর্থ বিতরণ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। অনুদান অনুমোদনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যাচাই কমিটি কাজ করে। একজন অফিস সহায়ক এককভাবে অনুদান অনুমোদন করতে পারে না।” উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এ প্রতিবেদন আপনি কোথা থেকে পেলেন? অফিসের যে ব্যক্তি এটি দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জেলা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া:

পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “সরকারি অনুদান সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ এলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর