অষ্টম শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা দক্ষ বাংলাদেশ গঠন করতে পারে

সময়: 2:47 pm - July 25, 2026 |

মো: মইনুল ইসলাম বাদল চৌধুরী: পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা পরিবার সমাজ রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে | তাই এবিষয়টি তুলে ধরার সামান্য প্রয়াস | বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই যুগে শুধু পুঁথিগত শিক্ষার ওপর নির্ভর করে একটি জাতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সময়ের চাহিদা হলো শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা দেওয়া, যা তাদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে কাজ করার দক্ষতাও গড়ে তুলবে। তাই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা চালু করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে তারা ভালো ফলাফল করলেও বাস্তব জীবনের নানা কাজ, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা পেশাভিত্তিক দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ে। এর ফলেই উচ্চশিক্ষা শেষে অনেক তরুণ-তরুণী বেকারত্বের মুখোমুখি হয়। অথচ অল্প বয়স থেকেই যদি তারা কোনো একটি কারিগরি বিষয়ে মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে, তাহলে পড়াশোনার পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থানের পথও তৈরি হবে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে মাধ্যমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে তারা নিজের আগ্রহ, যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী পেশা নির্বাচন করতে পারে। বাংলাদেশেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অষ্টম শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে কারিগরি শিক্ষা চালু করা যেতে পারে। এই শিক্ষার আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক ধারণা, রোবোটিক্স, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স, নির্মাণ প্রযুক্তি, কৃষি প্রযুক্তি, অটোমোবাইল, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, প্লাম্বিং, রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং, সেলাই ও ফ্যাশন ডিজাইন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত হবে।

কারিগরি শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, জাতীয় উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দক্ষ জনশক্তি দেশের শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতকে আরও শক্তিশালী করে। বিদেশেও দক্ষ কর্মীর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। যদি শিক্ষার্থীরা অল্প বয়স থেকেই আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তবে তারা বৈদেশিক কর্মসংস্থানে সফল হবে এবং দেশের রেমিট্যান্স আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনের শিক্ষা চালুর ফলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কম মর্যাদার চোখে দেখা হয়েছে। এই ভুল ধারণা দূর করতে হবে। দক্ষতা কোনোভাবেই সাধারণ শিক্ষার বিকল্প নয়; বরং এটি শিক্ষাকে আরও কার্যকর, বাস্তবমুখী ও জীবনঘনিষ্ঠ করে তোলে। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে আধুনিক কারিগরি ল্যাব ও প্রশিক্ষণ উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করতে হবে। চতুর্থত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কারিগরি শিক্ষাকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও মেধার ভিত্তিতে বিষয় নির্বাচন করার সুযোগ থাকলে তারা নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস অর্জন করবে। এতে বেকারত্ব কমবে, উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একটি আধুনিক, দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আনতেই হবে। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা চালুর উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে। সরকার, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সকল অংশীজনকে এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ আজকের দক্ষ শিক্ষার্থীই আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক, সফল উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং উন্নত বাংলাদেশের অন্যতম চালিকাশক্তি। তারা শুধু নিজের জীবনের উন্নয়নই করবে না, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমগ্র বিশ্বের কল্যাণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া এখনি দরকার |

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর