খনন করা খালগুলোকে আয়বর্ধক কাজে যুক্ত করার নির্দেশ ত্রাণমন্ত্রীর
তাহের মাহমুদ:
সারাদেশে বিভিন্ন সময়ে সরকারি অর্থে খনন ও পুনঃখনন করা খালগুলোকে শুধু পানি নিষ্কাশন বা জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেছেন, সরকারি অর্থে খনন করা এসব খাল পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে খাল খননের পর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শনিবার রাজধানীর কেআইবি সম্মেলন কেন্দ্রে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ত্রাণমন্ত্রী।
ত্রাণনির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বিতায় জোর:
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচিকে শুধু প্রচলিত সহায়তা ও ত্রাণনির্ভর রাখলে হবে না। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে আয়বর্ধক কর্মসূচি বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় খাল খনন করা হলে সেটিকে শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। ওই খালের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেটিও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। খাল খননের পর এর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে আয়বর্ধক কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী প্রকল্প নেওয়ার আহ্বান:
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে নতুন নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে হবে। একই ধরনের প্রচলিত কর্মসূচি দেশের সব এলাকায় বাস্তবায়ন না করে স্থানীয় পরিবেশ, মানুষের প্রয়োজন এবং বাজারব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের ধরন নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, এক এলাকার জন্য কার্যকর কোনো কর্মসূচি অন্য এলাকার মানুষের জন্য একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনা করা জরুরি। সরকারি প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হলো বা কতটি অবকাঠামো তৈরি হলো, তা দিয়ে মূল্যায়ন না করে প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাশরুম চাষের উদাহরণ:
আয়বর্ধক কর্মসূচির উদাহরণ দিতে গিয়ে মাশরুম চাষের কথা তুলে ধরেন ত্রাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিজে মাশরুম চাষের একটি উদ্যোগ পরিদর্শন করে এর সম্ভাবনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। একজন নারী উদ্যোক্তা তার খামারে মাশরুম চাষ করে সেটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। মন্ত্রীর মতে, মাশরুম চাষে তুলনামূলক কম পুঁজির প্রয়োজন হয় এবং এর বাজারও রয়েছে। ফলে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া গেলে অনেক মানুষ এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের আয় বাড়াতে পারেন। শীত মৌসুমেও মাশরুম চাষ করা সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ছোট পরিসরে এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করে ধীরে ধীরে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রচলিত সহায়তার পাশাপাশি আয়বর্ধক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে তারা দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।
২৫ উপজেলায় পরীক্ষামূলক কর্মসূচি:
মন্ত্রী জানান, নতুন ধরনের আয়বর্ধক কর্মসূচির কার্যকারিতা যাচাই করতে প্রাথমিকভাবে চলতি বছর ২৫টি উপজেলায় একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার পর এর ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে। কর্মসূচি সফল হলে পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও তা সম্প্রসারণ করা হবে। তিনি বলেন, নতুন কর্মসূচির ক্ষেত্রে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। কর্মসূচিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, মানুষের আয় কতটা বাড়ছে এবং তারা কতটা স্বাবলম্বী হতে পারছেন, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা গেলে সেটি দেশের বিভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ ও দরিদ্র এলাকায় প্রয়োগ করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
নিজ এলাকায় থেকেই পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব:
দুর্যোগপ্রবণ মানুষের আবাসন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রসঙ্গে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, মানুষকে তাদের নিজস্ব সমাজ ও পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনো আলাদা অঞ্চল বা আশ্রমধর্মী স্থানে পুনর্বাসন করার পরিবর্তে নিজ এলাকায় থেকেই যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, নিজের সমাজের মধ্যে বসবাস করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে একজন মানুষ নিজেকে সার্থক মনে করবেন এবং সমাজের সঙ্গে তার বন্ধনও অটুট থাকবে। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে শুধু একটি ঘর বা আশ্রয় দেওয়াই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সংযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এমনভাবে কর্মসূচি সাজাতে হবে, যাতে উপকারভোগী পরিবার নিজ এলাকায় থেকে আয় করতে পারে এবং ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।
১০ কেজি চাল থেকে ২০ কেজি করার প্রস্তাব:
প্রচলিত খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির পরিমাণ নিয়েও কথা বলেন ত্রাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন দরিদ্র মানুষকে ১০ কেজি চাল দেওয়ার বিষয়টি বর্তমান বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। বর্তমান বাজারে ১০ কেজি চালের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় একজন শ্রমজীবী মানুষ একদিন কাজ করেও প্রায় একই পরিমাণ অর্থ আয় করতে পারেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ কারণে শুধু অল্প পরিমাণ খাদ্যসহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে কীভাবে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার আহ্বান জানান তিনি। ত্রাণমন্ত্রী জানান, দরিদ্র মানুষের খাদ্যসহায়তায় চালের পরিমাণ ১০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ২০ কেজি করার একটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। এ জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে কর্মসূচিটি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সহায়তা পৌঁছানোর ওপর জোর:
সরকারি সহায়তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে অর্থের অপচয় ও অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এতে সহায়তার অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে। পাশাপাশি সরকারি অর্থ বিতরণে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও বেশি কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এতে একদিকে অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে অন্যায়ভাবে অর্থ আত্মসাতের সুযোগও কমবে।
কাবিখা-কাবিটার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব:
কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) এবং কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সমাজ ও মানুষের চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের রুচি, জীবনযাত্রা ও প্রয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সরকারি কর্মসূচির নাম ও কাঠামোও সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যেতে পারে। কাবিখা ও কাবিটাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করে দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী। প্রস্তাবিত কমিটিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান এবং মহাপরিচালককে সদস্য সচিব করার কথা বলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের একজন প্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) একজন প্রতিনিধিকেও কমিটিতে রাখার প্রস্তাব দেন। কমিটি আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়ে সুপারিশ করবে বলে জানান তিনি।
প্রকল্পের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানোর নির্দেশ:
সম্মেলনে মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রকৃত সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে বলেও নির্দেশ দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শুধু দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়; দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং তাদের জীবিকা পুনর্গঠনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ত্রাণ নয়, স্বাবলম্বিতায় গুরুত্ব:
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দুর্যোগপ্রবণ মানুষের জীবনকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ ও স্বাবলম্বী করতে হলে ত্রাণনির্ভরতার পরিবর্তে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি সহায়তা এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে একজন মানুষ একবার সহায়তা পাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে নিজের আয় দিয়ে পরিবার পরিচালনা করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, সরকারি উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কর্মসূচির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব বাড়ে। বিশেষ করে খাল খনন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি ও অন্যান্য আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, সচিব সাইফুল ইসলামসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।









