শিক্ষা জাতীয়করণসহ ১০ দফা দাবি, না মানলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি কারিগরি শিক্ষক-কর্মচারীদের
স্টাফ রিপোর্টার:শহিদুল ইসলাম:
শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ, আন্তঃবদলির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, পৃথক কারিগরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূরীকরণসহ ১০ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ। দ্রুত এসব দাবি বাস্তবায়ন না হলে সারাদেশে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনের নেতারা। শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবুল বাশার। তিনি বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের প্রধান ভিত্তি। অথচ সম্ভাবনাময় এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, বৈষম্য, প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে পিছিয়ে রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষা খাতের অন্যান্য শাখার তুলনায় কারিগরি শিক্ষার শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সময়মতো বেতন না পাওয়া, স্কেল অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক হয়রানি এবং আধুনিক শিক্ষা উপকরণের সংকটের কারণে কারিগরি শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত ১০ দফা দাবি:
১. শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ ও আন্তঃবদলির ব্যবস্থা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমুদয় আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারি চাকরির মতো আন্তঃবদলির নীতিমালা প্রণয়ন।
২. সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে কারিগরি ট্রেড চালু
দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে অন্তত দুটি করে কারিগরি ট্রেড কোর্স চালুর উদ্যোগ গ্রহণ।
৩. প্রতি ট্রেডে দুইজন ট্রেড ইন্সট্রাক্টর পদ পুনর্বহাল
পূর্বের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ট্রেডে দুইজন ট্রেড ইন্সট্রাক্টর নিয়োগের ব্যবস্থা পুনরায় চালু।
৪. সময়মতো বেতন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
প্রতি মাসের ১ তারিখের মধ্যে শতভাগ বেতন-ভাতা প্রদান নিশ্চিত করা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও অধিদপ্তরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. স্কেল হয়রানি বন্ধ ও আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা
বিএড, উচ্চতর স্কেল, এমপিওসহ সব ধরনের আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন এবং স্কেলসংক্রান্ত হয়রানি বন্ধ।
৬. শিক্ষক-কর্মচারী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন
শিক্ষকদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৃথক ‘শিক্ষক-কর্মচারী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন।
৭. আধুনিক ল্যাব ও ওয়ার্কশপ স্থাপন
সব এমপিওভুক্ত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ল্যাব ও ব্যবহারিক ওয়ার্কশপ স্থাপন।
৮. দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
নতুন কারিকুলাম উপযোগী দেশি ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি।
৯. সহকারী প্রধান শিক্ষক (কারিগরি) পদ সৃষ্টি
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক (কারিগরি) পদ সৃষ্টি।
১০. পৃথক কারিগরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ১০ম গ্রেড ও এমপিও সুবিধা
পৃথক কারিগরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, কারিগরি এইচএসসি (বিএমটি) কলেজের সহকারী গ্রন্থাগারিকদের ১০ম গ্রেড প্রদান এবং সব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা।
জাতীয়করণে সরকারেরও লাভ হবে:
লিখিত বক্তব্যে প্রকৌশলী আবুল বাশার বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ হলে শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবেন না, সরকারেরও হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষার গুণগত মানও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি চাকরির মতো আন্তঃবদলির নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি।
দুর্নীতি, হয়রানি ও বেতন বৈষম্যের অভিযোগ:
সংগঠনের নেতারা অভিযোগ করেন, মাধ্যমিক ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষকরা সময়মতো বেতন পেলেও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষকরা প্রায়ই বিলম্বে বেতন পান। তাদের দাবি, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ফাইল আটকে রেখে শিক্ষক হয়রানি করছেন। বিএড, উচ্চতর স্কেল ও এমপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
আধুনিক কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান:
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে কারিগরি শিক্ষায় যুগোপযোগী ল্যাব, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সংযোজনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা:
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, সরকার যদি দ্রুত ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তাহলে সারাদেশের কারিগরি শিক্ষক-কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজীজী, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদের সভাপতি প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান, উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাশেদ মোশারফ, এমপিওভুক্ত শিক্ষক পরিষদের সদস্য সচিব আশরাফুজ্জামান হানিফ, বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব নুরুল ইসলাম সিয়ামসহ বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।









