শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে বড় পরিবর্তন, সভাপতি নির্বাচনে আসছে নতুন নিয়ম
মিজানুর রহমান :
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনের বিদ্যমান নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে সভাপতি নির্বাচনের পদ্ধতি, সভাপতির ক্ষমতা, একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের সীমা এবং শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান প্রবিধানমালায় সংশোধনী এনে একটি নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে নতুন এসব বিধান কার্যকর হবে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। বৈঠকে খসড়া প্রবিধানমালার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের অনুমোদনের পর সংশোধনী চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনা শেষে এতে আরও পরিবর্তন বা সংশোধনী আসতে পারে।
সভাপতি নির্বাচনে নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব:
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী, প্রথমে ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন শ্রেণির সদস্য পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সদস্য নির্বাচন শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করতে হবে। ওই সভায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সভাপতিত্ব করবেন। উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সভাপতি নির্বাচনের সভায় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচনের বিধান রাখার প্রস্তাবও করা হয়েছে। আর পদত্যাগ, মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে সভাপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন সভাপতি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে।
সভাপতি হওয়ার সুযোগ বাড়ছে:
খসড়া প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি এবং কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা কর্মচারী ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না—এমন বিধানও রাখা হয়েছে। একই ব্যক্তি একই ধরনের সর্বোচ্চ দুটি এবং মেয়াদভিত্তিক ধরনের সর্বোচ্চ তিনটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন—এমন সীমাও প্রস্তাব করা হয়েছে।
গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নেও পরিবর্তন:
গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রবিধানে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম প্রস্তাবের বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের সংশোধিত প্রবিধানে ক্ষেত্রবিশেষে বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনার বিধান যুক্ত করা হয়। সেখানে সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক বা অধ্যাপক এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাসহ নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম প্রস্তাবের সুযোগ রাখা হয়। তবে ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত প্রবিধানে গভর্নিং বডির সভাপতি পদে সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তালিকায় কোনো ব্যক্তির নাম আগে বা পরে থাকার বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
সভাপতির ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাব:
খসড়া প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির নির্বাচিত সভাপতির কিছু ক্ষমতা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতাও রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি সরকারের সিদ্ধান্ত ও বিধি অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, সহকারী প্রধান ও কর্মচারী নিয়োগ করবে। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সুপারিশ করা শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতিও দেওয়া যাবে।
শিক্ষক নিয়োগেও পরিবর্তন:
প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধনপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মচারী নিয়োগ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের পদোন্নতির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের সংশোধিত প্রবিধানে নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছিল। নতুন খসড়ায় এ বিষয়গুলোসহ নিয়োগসংক্রান্ত বিধান পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রবিধানমালার কয়েকটি স্থানে ‘শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান’ শব্দের পরিবর্তে নতুন পরিভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এখনো চূড়ান্ত নয়:
সভায় অংশ নেওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, খসড়াটি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। এরপর শিক্ষামন্ত্রী অনুমোদন দিলে তা চূড়ান্ত করা হবে এবং পরে প্রবিধানমালা আকারে জারি করা হবে। তিনি বলেন, ‘এটি এখনই চূড়ান্ত হয়েছে, তা বলা যাবে না। আলোচনার মাধ্যমে আরও সংশোধনী আনা হতে পারে।’ ফলে প্রস্তাবিত বিধানগুলো চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনুমোদনের পরই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে।









