খেলাপি ঋণ-সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় ১,২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্প
জিয়াউল হক টুটুল:
উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং চলমান ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা দিতে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) নামের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন, আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে একনেকের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। একনেকের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে সভাপতিত্ব করবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বৈদেশিক অর্থায়ন হিসেবে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) থেকে আসবে। বাকি ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট অর্থের বড় অংশই বৈদেশিক সহায়তা থেকে আসছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আর্থিক খাতের প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ:
প্রকল্পের নথিতে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক সেবার চাহিদা বাড়ার কারণে আর্থিক খাতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। তবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে খাতটিকে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মধ্যে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের দুর্বলতা, পুরোনো আইসিটি ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা অন্যতম। আর্থিক খাতের তদারকিতে ব্যবহৃত তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ঘাটতিও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে সাইবার হামলা, আন্তসীমান্ত আর্থিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য নতুন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, এসব ঝুঁকি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে শুধু আর্থিক খাত নয়, আমানতকারীদের আস্থা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
‘সেফটি নেট’ শক্তিশালী করার উদ্যোগ:
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, আর্থিক খাতের ‘সেফটি নেট’ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা করাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো ও তদারকি সক্ষমতা আধুনিকায়ন করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, আইসিটি অবকাঠামোসংক্রান্ত ক্রয়প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শক সেবা নেওয়া হবে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তদারকি কার্যক্রম আরও আধুনিক ও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
আমানত বিমা ব্যবস্থায় গুরুত্ব:
প্রকল্পে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর আওতায় আমানত বিমা ট্রাস্ট ফান্ডের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ব্যাংক কোনো কারণে সংকটে পড়লে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য অর্থ পরিশোধের সময় কমানো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো ব্যাংক আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে তার সংকট ব্যবস্থাপনা, পুনর্গঠন বা প্রয়োজনীয় রেজল্যুশন কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষমতা বাড়ানো হবে প্রকল্পের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার:
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ানোও এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। প্রকল্পের আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন কাঠামো, সুশাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তি আধুনিকায়ন নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সুশাসন শক্তিশালী করাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। প্রকল্পের দ্বিতীয় প্রধান উপাদানের আওতায় আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের ব্যয়:
প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয়ের বড় অংশ রাখা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়নের জন্য। প্রকল্পের আওতায় আইসিটি সরঞ্জাম কেনায় ৭১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনার জন্য রাখা হয়েছে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া ডেটাবেজের জন্য ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যান্য আইসিটি ও অফিস সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার জন্যও প্রকল্পে অর্থ রাখা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি কার্যক্রমকে আরও আধুনিক করার পাশাপাশি আর্থিক খাতের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিন প্রধান উপাদানে বাস্তবায়ন:
এফএসএসপি-২ প্রকল্পের তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে। এগুলো হলো—তদারকি সক্ষমতা ও ব্যবস্থার উন্নয়ন; আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠনে সহায়তা; এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান। প্রথম উপাদানের মাধ্যমে আর্থিক খাতের তদারকি কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট সক্ষমতা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। দ্বিতীয় উপাদানে থাকবে নিরাপত্তাব্যবস্থা, ব্যাংক রেজল্যুশন, পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার। আর তৃতীয় উপাদানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দ্বিতীয় প্রকল্প:
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগে যে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করেছিল, তার ধারাবাহিকতায় এফএসএসপি-২ নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি, ব্যাংক সংস্কার এবং আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আধুনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই নতুন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষা:
প্রকল্প প্রস্তাবটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়। এরপর একই বছরের ২৩ নভেম্বর বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত টিএপিপি চলতি বছরের মে মাসে পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। কমিশনের মূল্যায়নে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আর্থিক খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, ব্যাংক সংস্কার, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতার মতো সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। এসব সমস্যা একক কোনো উদ্যোগে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করার সুযোগ তৈরি হবে। একনেকের অনুমোদন পাওয়ার পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হবে। পাঁচ বছরের এ উদ্যোগ শেষ হলে দেশের আর্থিক খাতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ব্যাংক সংস্কারের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।









