কৃষিপণ্যের আমদানি কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
শহিদুল ইসলাম:
দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে—এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য কৃষি গবেষণা, উন্নত জাত উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সেচ সুবিধা ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণ দ্রুত সম্প্রসারণ করে তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক করার পাশাপাশি দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ের নিজ কার্যালয় থেকে হেঁটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এসব তথ্য জানান।
উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা ও প্রযুক্তিতে গুরুত্ব:
বৈঠকে কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়। এ সময় দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী কৃষি গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতার মতো প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম নতুন জাতের সম্প্রসারণেও জোর দিতে বলেন তিনি। কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত সেচ এবং যান্ত্রিকীকরণের সুবিধা সহজলভ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
সরিষার উৎপাদন বেড়েছে:
বৈঠকে ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে কৃষি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সরিষার উৎপাদন ছিল ৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন আরও বেড়ে ১৫ দশমিক ৪১ লাখ টনে পৌঁছেছে। দেশীয়ভাবে ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়াতে সরিষার আবাদ সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন প্রযুক্তি:
দেশের পেঁয়াজের উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতেও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বৈঠকে জানানো হয়। কৃষকের পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত সম্প্রসারণের কার্যক্রমও চলছে। এ ছাড়া লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল নতুন ফসলের জাত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
উদ্ভাবিত হয়েছে ১ হাজার ৯০টি ফসলের জাত:
কৃষি গবেষণার অগ্রগতির তথ্যও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন ফসলের মোট ১ হাজার ৯০টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানের জাত রয়েছে ১৫৫টি। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ও কৃষকের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় এক হাজারের বেশি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্যও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। কৃষি গবেষণার এসব ফলাফল যাতে দ্রুত মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছায় এবং উৎপাদনে এর সুফল পাওয়া যায়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
কৃষিযন্ত্র সহজলভ্য করার উদ্যোগ:
কৃষিতে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে বৈঠকে। দেশীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষকের কাছে সুলভমূল্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে একদিকে যেমন শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকের লাভ বাড়ানো সম্ভব হবে—বৈঠকে এ বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সৌর সেচে জোর:
কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎনির্ভর সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ২ হাজার ৬১৭টি সৌর সেচব্যবস্থা রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎনির্ভর সেচ আরও বাড়ানো গেলে কৃষকের সেচব্যয় কমার পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনকে আরও সাশ্রয়ী ও টেকসই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪৩ লাখ কৃষক পাবেন কৃষক কার্ড:
কৃষকদের সরকারি সহায়তা সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড কর্মসূচির বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।
উৎপাদন খরচ ও ন্যায্যমূল্যের ওপর গুরুত্ব:
বৈঠকে কৃষিযান্ত্রিকীকরণ, সৌর সেচ, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে কৃষক যাতে তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।









