গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে :আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে —বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
মো: সাব্বির আহমেদ:
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র কেবল সরকার গঠনের কোনো সাময়িক প্রক্রিয়া নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। আগামীকাল সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালিত হবে। বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকলে একটি সমাজ স্বৈরাচার, শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ:
বিবৃতিতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে।’ তার দাবি, ওই সময়ে দেশের জনগণ ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকার যথাযথভাবে কার্যকর না থাকায় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না’
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের মানুষ বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে। তার মতে, অতীতে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের প্রত্যাশা থেকেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জামায়াত আমিরের ভাষায়, ‘এমনই এক প্রেক্ষাপটে দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জুলাই বিপ্লব সংঘটিত করেছে। এই বিপ্লব ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈষম্যমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
‘গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই’
ইনসাফ, সততা ও মানবিক মূল্যবোধনির্ভর বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে গণতন্ত্রকে সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে জামায়াতে ইসলামী দেশবাসীর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী দেশে সমতা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’ একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজে সহিংসতা, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। দেশকে গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের মতো ঘটনার দিকে আর কোনোভাবেই ঠেলে দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করার আহ্বান:
বিবৃতিতে দেশের প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থা নিয়েও বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনকে সংকীর্ণ দলীয়করণমুক্ত করার আহ্বান জানান। তার মতে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত না হয়ে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা প্রয়োজন। প্রশাসনে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমুক্ত দেশ গড়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। রাষ্ট্রীয় সেবা ও শাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব:
ডা. শফিকুর রহমানের বিবৃতিতে নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের কথা বলার অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় সমান অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়ে এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রেও গণতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান:
বিবৃতির শেষাংশে বৈষম্যমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ন্যায্য নাগরিক সুবিধা আদায় এবং যেকোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বৈষম্যমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব।









