অব্যবহৃত ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ, হবে অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার

সময়: 9:31 am - September 21, 2026 |

তালুকদার বেলাল:

দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ হিসেবে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গত ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব ট্রমা সেন্টার চালুর বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে বিদ্যমান ২৪টি ট্রমা সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে মহাসড়কের পাশে খালি জায়গায় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

চিকিৎসক-নার্স ও সরঞ্জাম নিশ্চিতের উদ্যোগ:

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিকস নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে। বৈঠকে প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে মেশিন, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদিত বাজেট থেকে করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বাসসকে বলেন, মহাসড়কগুলোকে কেন্দ্র করে ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত এগুলোকে ‘অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সেন্টার’ হিসেবে রূপান্তর করা হবে। তিনি জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজও চলছে। ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থাকে নিয়মিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি টেকসই অংশ হিসেবে পরিচালনার লক্ষ্য রয়েছে।

কেন চালু হয়নি ট্রমা সেন্টারগুলো:

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে বিভিন্ন সময়ে এসব ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। গুরুতর আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় এনে প্রাণহানি কমানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তবে প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রশাসনিক অনুমোদনের অভাবে বছরের পর বছর ধরে অধিকাংশ কেন্দ্র অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র দুটিতে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চালু রয়েছে। এর মধ্যে একটি সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গুরুতর আহতদের দ্রুত চিকিৎসার পরিকল্পনা:

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ট্রমা সেন্টারগুলোতে মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল। তিনতলা ভবনগুলোতে ২০ শয্যার আইসিইউ এবং ৪০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি ১০ জন নার্স, ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও অন্যান্য টেকনিশিয়ানেরও থাকার কথা ছিল। কিন্তু কোনো কেন্দ্রেই প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

সিরাজগঞ্জের ট্রমা সেন্টারও দীর্ঘদিন বন্ধ:

দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা কেন্দ্রগুলোর একটি সিরাজগঞ্জ সদরের মুলিবাড়ি ট্রমা সেন্টার। ঢাকা-রাজশাহী-রংপুর মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে ২০২০ সালে প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় ছয় বছর অব্যবহৃত থাকার পর গত কোরবানির ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ২১ মে থেকে ১৪ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছিল। পরে আবার সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ২৪ কেন্দ্র:

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাবনার আটঘরিয়া, বগুড়ার শেরপুর, সিরাজগঞ্জ সদর ও উল্লাপাড়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, গোপালগঞ্জ সদর, মাদারীপুরের শিবচর, মানিকগঞ্জের শিবালয়, শরীয়তপুরের জাজিরা, ফরিদপুরের ভাঙ্গা (মধুখালী), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর, ঢাকার ধামরাই, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, হাটহাজারী ও রাউজান, কুমিল্লার দাউদকান্দি, ময়মনসিংহের ভালুকা, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং হবিগঞ্জের বাহুবলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব ট্রমা সেন্টার রয়েছে।  সরকারের নতুন উদ্যোগের ফলে এসব কেন্দ্রকে শুধু ভবন হিসেবে পড়ে না রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি ও জরুরি পরিবহন সুবিধার আওতায় এনে কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক:

ট্রমা সেন্টার চালুর পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে এ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত আহত ব্যক্তিকে জরুরি চিকিৎসার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মহাসড়কে দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার প্রয়োজন কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মহাসড়ককেন্দ্রিক জরুরি চিকিৎসাসেবার একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের পথে এগোবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর