সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার: জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ

সময়: 9:06 am - September 26, 2026 |

জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক:

জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।

জনগণের ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার:

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার, যেখানে সবাই নিরাপদে ও সমান মর্যাদায় বসবাস করতে পারবেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করা হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নে গুরুত্ব:

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল দেশের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে তিনি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এসব কার্ডকে সমন্বিত করে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন:

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষা কারিকুলামে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির বিভিন্ন কার্যক্রমের সামঞ্জস্যের কথাও ভাষণে তুলে ধরেন।

প্রযুক্তির সুযোগ সবার জন্য নিশ্চিত করার আহ্বান:

বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান:

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। আঞ্চলিক বাণিজ্য, কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশগুলো একে অন্যের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় পারস্পরিক সহায়তা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

সংঘাতের সমাধান আলোচনায়:

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদাকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি। জাতিসংঘকে সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান:

রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

জলবায়ু ন্যায়বিচারে জোর:

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জোরদারের আহ্বান জানান। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান তিনি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার:

নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’—এর আলোকে বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু যাতে তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কাজ করছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর