ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে আনতে চায় ইসি: সিইসি

সময়: 7:54 am - October 28, 2026 |

নভেম্বরেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা, ইউপি নির্বাচনে প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ

মানব কথা ডেস্ক:

শুধু একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নয়, বরং ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে অনুষ্ঠানের টেকসই সংস্কৃতি গড়ে তোলাই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও একই মানদণ্ডে আয়োজনের চেষ্টা করবে কমিশন। সম্ভব হলে আরও উন্নত মানের নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সিইসি বলেন, ‘শুধুমাত্র একটা ভালো নির্বাচন করাই আমাদের লক্ষ্য নয়। ভবিষ্যতে যাতে সবগুলো নির্বাচন সেই একই মানদণ্ডের হয়, সেই প্রচেষ্টা আমাদের থাকবে।’ তিনি বলেন, একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করেই কমিশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতেও একই মান বজায় রাখার মতো নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কমিশন বদ্ধপরিকর। গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সিইসি বলেন, কমিশনের ওপর কোনো পক্ষের চাপ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে আশাবাদী কমিশন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রার্থীসহ সব অংশীজনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পোস্টাল ভোটিংয়ের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও কারাবন্দীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির কথাও তুলে ধরেন সিইসি। তিনি বলেন, কমিশনের অঙ্গীকারে কোনো ঘাটতি নেই। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নভেম্বরের মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে। তাই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা প্রয়োজন। সিইসি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা খুবই দরকার। এজন্য আমরা তাদের সঙ্গে বসার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই নভেম্বর মাসের মধ্যেই তাদের সঙ্গে বসব আমরা।’ সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে টেকসই করতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। নির্বাচনে জালিয়াতি হলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে জানিয়ে সিইসি বলেন, ভোটকেন্দ্র, ভোটার তালিকা, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের জন্য ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনগতভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনার আওতায় থাকা ইউনিয়ন পরিষদগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে নির্বাচন হতে পারে বলে জানান তিনি। ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা ও প্রাণহানিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা বেশি দেখা গেছে। এ কারণে আচরণবিধি বাস্তবায়নে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারিও জোরদার করা হবে। তিনি জানান, প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরাও থাকবে। এতে সহিংসতা বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে তা রেকর্ডে রাখা সম্ভব হবে। সিইসি বলেন, ‘আচরণবিধি আমরা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। এ ব্যাপারে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’

নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাকে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান সিইসি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশন ও সামগ্রিক নির্বাচনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে যাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা, নির্বাচন কমিশনকে আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ লক্ষ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই কার্যক্রমে প্রায় ১০ লাখ নারী ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান সিইসি। তিনি বলেন, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা মানুষের আস্থা ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নির্বাচনী কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সব অংশীজনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন সিইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এই সহযোগিতা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, সাংবাদিকদের জন্য কমিশনের দরজা উন্মুক্ত থাকবে। তাঁরা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নীতিমালা অনুসরণ করে পরিচয়পত্র দেওয়া হবে।জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র কমিশন থেকে দেওয়া হবে। স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রেসক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে জানান তিনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা কার্যকর রাখার পরিকল্পনার কথা জানান সিইসি। তিনি বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। নির্বাচনী অনিয়মের প্রতিকার যেন স্থানীয় পর্যায়েই দ্রুত পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় কমিশন। কালো টাকা ব্যবহার ও ভোট কেনার অভিযোগ পাওয়া গেলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, অনিয়ম প্রতিরোধে কমিশনের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সিইসি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণ করেন। নির্বাচন না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদসহ কয়েকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও কার্যক্রমের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনেও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা প্রয়োজন হয়। এ কারণে ইউপি নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরপরই পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এসএসসি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা এবং বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী থাকবে না বলেও জানান সিইসি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ বাড়ানোকে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন সিইসি। তিনি বলেন, নারী ভোটার থাকলেও প্রার্থী হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা তুলনামূলক কঠিন। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নিরুৎসাহ, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানিমূলক প্রচারণা নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোতে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য আইনে রাখা হয়েছে বলে জানান সিইসি। তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। তরুণদের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে ভোটার হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান সিইসি। তিনি বলেন, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে যাঁদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তাঁরা ভোটার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আগে বছরের ১ জানুয়ারিকে ভিত্তি ধরে বয়স গণনা করা হলেও এবার নতুন সুযোগের ফলে আরও বেশি তরুণ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সবশেষে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক ও ভোটারসহ সব অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেন সিইসি। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর