পরিবেশ অবহেলার মূল্য দিচ্ছে মানবসভ্যতা
নিজাম উদ্দিন : পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক তাপপ্রবাহ, ভয়াবহ বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, দাবানল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো বিশ্ববাসীকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দুর্যোগের প্রতিটি ঘটনা সরাসরি মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়, কারণ প্রাকৃতিক জলবায়ুরও নিজস্ব পরিবর্তনশীলতা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, বন উজাড়, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, দূষণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও অনেক ধরনের চরম আবহাওয়ার প্রভাব বেড়েছে। ফলে আজকের সংকটের একটি বড় অংশ মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।জলবায়ু বিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু মানুষের কর্মকাণ্ড সেই পরিবর্তনের গতি ও তীব্রতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। শিল্পায়নের পর থেকে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণগুলোর একটি।” তাঁর মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।পরিবেশবিদ ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “বনভূমি ধ্বংস, নদী দখল, জলাভূমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্যের সংকটের মতো সমস্যাগুলোর প্রভাব মানুষের জীবনে আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।” তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়নের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষও পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রভাব অনুভব করছেন। সাতক্ষীরার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, “আগে আবহাওয়ার একটা নিয়ম ছিল। এখন কখন খরা হবে, কখন অতিবৃষ্টি হবে, কিছুই বোঝা যায় না। এতে চাষাবাদ খুব কঠিন হয়ে গেছে।” সুনামগঞ্জের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার বলেন, “কখনো হঠাৎ বন্যা, আবার কখনো দীর্ঘ সময় বৃষ্টি নেই। মানুষের জীবনযাত্রা আগের মতো নেই।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর শারমিন আক্তার জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা, পানিবাহিত রোগ, মশাবাহিত রোগ এবং অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।” কৃষি অর্থনীতিবিদ ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “খরা, অতিবৃষ্টি এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব খাদ্য সরবরাহ, বাজারমূল্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর পড়ছে।” তিনি মনে করেন, কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করতে গবেষণা, প্রযুক্তি এবং কৃষক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। খুলনার জেলে মো. সেলিম বলেন, “সমুদ্রের আবহাওয়া এখন অনেক দ্রুত বদলে যায়। মাছ ধরতে গেলেও আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকি নিতে হয়।” রাজশাহীর কলেজশিক্ষার্থী মেহজাবিন ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের পৃথিবী নির্ধারণ করবে।”বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বনভূমি সংরক্ষণ, নদী ও জলাভূমি রক্ষা, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
পরিবেশ নীতিবিদ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়-সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।” সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ছে। বরিশালের গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, “প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, গাছ লাগানো এবং পানি অপচয় বন্ধ করার মতো ছোট ছোট কাজও বড় পরিবর্তনের অংশ হতে পারে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, “প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। এখনই দায়িত্বশীল আচরণ না করলে আগামী প্রজন্মকে আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান সংকট প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব না হলেও মানবসৃষ্ট ঝুঁকি কমানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল উন্নয়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা যেতে পারে। এখন সময় প্রকৃতির সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার।








