২ কোটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী পাবেন স্মার্ট কার্ড
মিজানুর রহমান:
দেশের প্রায় দুই কোটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিফায়েড এডু আইডি ও স্মার্ট কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন’ নামে একটি মেগাপ্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে প্রকল্পটি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। মাউশি প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
এডু আইডি ও স্মার্ট কার্ডে ব্যয় ৬ হাজার কোটি:
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় সার্ভার ও ডাটাবেজ স্থাপন করা হবে। ইউনিফায়েড এডু আইডি, স্মার্ট কার্ড, কেন্দ্রীয় সার্ভার ও ডাটাবেজ তৈরিতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রায় দুই কোটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর হিসাবে এ খাতে মাথাপিছু ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সিটি করপোরেশন, জেলা শহর ও উপজেলা এলাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এর আওতায় আসবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ লাখ শিক্ষক পাবেন ট্যাব:
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান কার্যক্রম জোরদারে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষককে বিনামূল্যে আধুনিক ট্যাবলেট কম্পিউটার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ট্যাবের জন্য গড়ে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। শুধু ডিভাইস বিতরণ নয়, শিক্ষকদের আধুনিক ই-লার্নিং পদ্ধতিতে দক্ষ করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ডিজিটাল পেডাগজি ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্লাস পরিচালনার প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ট্যাব বিতরণ ও প্রশিক্ষণ মিলিয়ে এ দুই খাতে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ প্যানেল:
প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ এডুকেশন প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়নে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমাতে ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ, ক্যাম্পাস এরিয়া নেটওয়ার্ক ও ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), জাতীয় কনটেন্ট রিপোজিটরি এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও ডাটা অ্যানালিটিকস সিস্টেমও স্থাপন করা হবে। ইন্টারনেট কানেকটিভিটি, ক্যাম্পাস নেটওয়ার্ক, এলএমএস-কনটেন্ট রিপোজিটরি এবং মনিটরিং-অ্যানালিটিকস ব্যবস্থার জন্য প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
সমীক্ষার জন্য আলাদা প্রকল্প:
মূল প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পৃথক একটি প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদের এ সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে কনসালট্যান্সি সেবায় ৪৩৭ দশমিক ৯২ লাখ টাকা, ওয়ার্কশপ আয়োজনে ৩০ লাখ টাকা, কম্পিউটার সরঞ্জামে ৮ দশমিক ৬০ লাখ টাকা এবং সম্মানী খাতে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মূল প্রকল্পের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ও চূড়ান্ত বাজেট কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় গুরুত্ব:
প্রস্তাবিত প্রকল্পে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এআই ও কোডিংসহ প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি, স্মার্ট ক্লাসরুম ও আইসিটি সুবিধা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোও প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অডিও-ভিজ্যুয়াল ও ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তির মাধ্যমে আনন্দদায়ক শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়েছে। মাউশির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও বাড়বে। তবে প্রকল্পটি বর্তমানে প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই, পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা এবং পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষে এর চূড়ান্ত ব্যয় ও বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারিত হবে।









