নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়: হাইকোর্ট

সময়: 6:25 am - September 23, 2026 |

কোর্ট রিপোর্টার:

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলেও শুধু এ কারণে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য নির্দেশনামূলক; এটি এমন কোনো বাধ্যতামূলক সময়সীমা নয়, যা অতিক্রম করলেই মামলা বা বিচারপ্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে যাবে। ‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন রায়টি দেন। সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আদালত রায়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলার বিচারিক কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত করার কোনো আইনি পরিণতি রাখা হয়নি। বরং সময়সীমার মধ্যে বিচার শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে।

১৮০ দিনের সময়সীমা নির্দেশনামূলক:

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য ১৮০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করতে না পারলে বিচারিক কার্যক্রম থেমে যাবে—আইনে এমন কোনো বিধান নেই। রায়ে আদালত বলেন, আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও এর ফলে মামলা বাতিল বা বিচারপ্রক্রিয়া স্থগিত করার সুযোগ নেই। ১৮০ দিনের বিধানটি বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। একই সঙ্গে আদালত উল্লেখ করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে কেন তা সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর ও পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

যে মামলাকে কেন্দ্র করে রায়:

হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত এসেছে রাজধানীর শ্যামপুর থানায় দায়ের করা একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাকে কেন্দ্র করে। মামলার নথি অনুযায়ী, ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর সঙ্গে আসামি মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেল ওই ছাত্রীকে একটি বাসায় নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করেন। পরে একাধিকবার ধর্ষণের ফলে ওই ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। ঘটনার পর ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি ভুক্তভোগীর মা রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারের জন্য পাঠানো হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পাভেল আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন।

১৮০ দিনের সময়সীমা নিয়ে রিট:

পরে পাভেল ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। তার দাবি ছিল, মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে পৌঁছালেও আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারার বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। রিটে আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে কেন তা সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনও যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন রিটকারী। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরবর্তী সময়ে ওই স্থগিতাদেশ কয়েক দফা বাড়ানো হয়।

হাইকোর্টে রুল খারিজ:

দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট ২০২৩ সালের ৭ জুন রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়। রায়ে আদালত মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, ট্রাইব্যুনাল মামলাটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ নিয়েছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আসামি জামিন পান এবং পরবর্তী সময়ে মামলার কার্যক্রমও চলতে থাকে। আদালত আরও উল্লেখ করেন, রিটকারী ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী কয়েকটি আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপি হাইকোর্টে উপস্থাপন করেননি। আদালতের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি রিটকারীর আচরণ সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে শুধু ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রমের যুক্তিতে মামলার বিচার স্থগিত রাখার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই বলে সিদ্ধান্ত দেন হাইকোর্ট।

বিচার বিলম্বিত হলেও মামলা চলবে:

হাইকোর্টের এই রায়ের মূল তাৎপর্য হলো—নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও সেই সময়সীমা অতিক্রম করলেই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে না। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করতে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ থাকলেও আসামি শুধু সময়সীমা পার হওয়ার কারণে বিচার থেকে অব্যাহতি পাবেন না। একইভাবে মামলার কার্যক্রমও স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হবে না। আদালত বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনে বিলম্ব হলে তার আইনগত প্রতিকার বা প্রশাসনিক জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু ১৮০ দিন পার হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া বাতিল করার কোনো বিধান আইনে নেই। মামলায় রিটকারী পাভেলের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন এম. এইচ. রশীদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর