বাংলাদেশের সাশ্রয়ী আবাসন খাতে এডিবির ১০ কোটি ডলারের ঋণ

সময়: 7:34 am - September 27, 2026 |

জিয়াউল হক টুটুল:

বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও দুর্যোগসহনশীল আবাসন ঋণের সুযোগ বাড়াতে ১০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বিশেষ করে নারী এবং প্রচলিত ব্যাংকঋণের আওতার বাইরে থাকা পরিবারগুলো এ অর্থায়নের সুবিধা পাবে। এডিবির এই অর্থ পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং এর আওতাভুক্ত যোগ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘমেয়াদি ও জামানতবিহীন আবাসন ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব ঋণ ব্যবহার করে পরিবারগুলো নতুন ঘর নির্মাণ, বিদ্যমান ঘরের সম্প্রসারণ এবং পুরোনো ঘর মেরামত ও উন্নয়ন করতে পারবে। এডিবির প্রকল্প নথি অনুযায়ী, ঋণের অর্থ স্থানীয় মুদ্রায় একটি ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে পিকেএসএফের কাছে যাবে। পরে যোগ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্ধারিত সুবিধাভোগীদের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে। ঋণের মেয়াদ কমপক্ষে পাঁচ বছর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

নারী ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে অগ্রাধিকার:

এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো আবাসন অর্থায়নে নারী ও নিম্ন আয়ের পরিবারের প্রবেশাধিকার বাড়ানো। এডিবির প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, মোট ঋণের অন্তত ৮০ শতাংশ নারীদের দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। প্রচলিত ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে জামানত, নিয়মিত আয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মতো বিভিন্ন শর্ত থাকায় অনানুষ্ঠানিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবার আবাসন ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়। নতুন এই অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় তিন ধরনের আবাসন ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এগুলো হলো—নতুন ঘর নির্মাণ, বিদ্যমান ঘরের সম্প্রসারণ এবং ঘর মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণ।

দুর্যোগসহনশীল বাড়ি নির্মাণে গুরুত্ব:

বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটিতে দুর্যোগসহনশীল আবাসন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘর নির্মাণের নকশা, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও ঝুঁকি মোকাবিলার উপযোগী ব্যবস্থা প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রী, নকশা ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় সুবিধাভোগীদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ থাকবে। এডিবি বলছে, আবাসন অর্থায়নের পাশাপাশি প্রকল্পটি পিকেএসএফ ও অংশগ্রহণকারী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতেও কাজ করবে। ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ এবং ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগও থাকবে।

২০৩১ সালের মধ্যে ৪০ হাজার পরিবার:

প্রকল্পের আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার পরিবারকে আবাসন ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩২ হাজার নারী এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী অন্তত ২৪ হাজার ঋণগ্রহীতা থাকার লক্ষ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি সুবিধাভোগীদের আর্থিক ও ভূমিসংক্রান্ত সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আবাসনের অধিকার এবং নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। নারীদের আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঋণগ্রহীতাদের পারিবারিক ও বসবাসসংক্রান্ত ব্যবস্থার যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণের বিষয়টিও প্রকল্পের অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।

আবাসন অর্থায়নব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ:

এডিবির মতে, বাংলাদেশে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়নের সুযোগ এখনও সীমিত। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আবাসন ঋণের বড় অংশ তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে পিছিয়ে থাকে। এ অবস্থায় পিকেএসএফের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে আবাসন অর্থায়নের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এডিবির প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, পিকেএসএফের অংশীদার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আবাসন অর্থায়নের একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।  প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আবাসন খাতে বেসরকারি অর্থায়নের অংশগ্রহণও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে যোগ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থায়নের মাধ্যমে এ ধরনের আবাসন ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারবে—এমন ব্যবস্থার কথাও এডিবির প্রকল্প নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

জলবায়ু অভিযোজন তহবিল থেকেও অর্থায়ন:

১০ কোটি ডলারের ঋণের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তার জন্য অনুদানের ব্যবস্থাও রয়েছে। এডিবির প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, অর্থায়নের একটি অংশ জলবায়ু অভিযোজনসংক্রান্ত তহবিল থেকে আসবে। দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ বাড়ি নির্মাণে এ অর্থায়ন ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি মূল্যায়ন ও জলবায়ুজনিত ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা ব্যবস্থাও জোরদার করা হবে।  এডিবির এই উদ্যোগের ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য আবাসন ঋণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে নারী, অনানুষ্ঠানিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবার এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর