সাংবাদিকতার চালচিত্র বদলে দিয়েছিলেন নজরুল: আবদুল হাই শিকদার
মিজানুর রহমান:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। সাংবাদিকতাকে তিনি কেবল সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; শোষণ-বঞ্চনা, অন্যায়, বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, নারীমুক্তি, জনগণের অধিকার এবং স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। ‘নবযুগ’ ও ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সাংবাদিকতার প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন আনেন এবং শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখান। আবদুল হাই শিকদারের মতে, নজরুলের সাংবাদিকতা নিছক সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর লেখায় সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা, সাধারণ মানুষের অধিকার এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছে। ফলে সাহিত্যিক নজরুলের পাশাপাশি সাংবাদিক নজরুলও বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছেন।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ও কারাবরণ
নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার কারণে তাঁর কারাবরণকে সাংবাদিকতা ও ঔপনিবেশিকবিরোধী অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন আবদুল হাই শিকদার। তিনি বলেন, দেবী দুর্গার আবাহনের রূপকের মাধ্যমে নজরুল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কবিতাটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে এবং নজরুলকে গ্রেপ্তার করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। আবদুল হাই শিকদার বলেন, নজরুল এসে সাংবাদিকতার চালচিত্র বদলে দেন। কবিতা দিয়ে সম্পাদকীয় লেখা এবং শিরোনাম করার নতুন রীতিও তিনি প্রবর্তন করেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নজরুলকে তুলে ধরার আহ্বান:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নজরুলের সাহিত্য যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার। তাঁর মতে, নজরুলের সাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও ব্যাপকভাবে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নজরুল ইনস্টিটিউটে কাজ করার সময় চীনা, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় নজরুলের সাহিত্য অনুবাদের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এসব উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে কর্মকর্তাদের নজরুলের রচনার ইংরেজি অনুবাদ উপহার দেওয়া হলে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন—১৯২২ সালে একজন কবি সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলেছেন এবং শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ইরান, মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরবেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি নজরুলের সাহিত্যকর্মের মানসম্মত অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রচারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনে আরও গবেষণার প্রয়োজন:
দীর্ঘদিনের নজরুল গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবদুল হাই শিকদার বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের অনেক গভীর দিক এখনও যথাযথভাবে পাঠ ও বিশ্লেষণ করা হয়নি। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় নজরুলচর্চার একটি অংশ অতিরিক্ত আবেগনির্ভর থাকায় কবির চিন্তা, দর্শন ও সৃষ্টির গভীরতা যথাযথভাবে সামনে আসেনি। আধুনিক নজরুলচর্চার ধারায় কবি আবদুল কাদিরের পর কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও শাহাবুদ্দীন আহমদের মতো গবেষকের অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নজরুলের সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রয়োজন।
নজরুল ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে ভাবগত যোগসূত্রের দাবি:
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনের রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে ভাবগত যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের মা কলকাতা বেতারের ‘এ’ গ্রেডের নজরুলসংগীত শিল্পী ছিলেন এবং জিয়াউর রহমান ছোটবেলা থেকেই নজরুলের চেতনায় অনুপ্রাণিত ছিলেন বলে তাঁর ধারণা। আবদুল হাই শিকদারের বক্তব্য অনুযায়ী, নজরুল তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। একইভাবে ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার জায়গায় তিনি দুজনের মধ্যে একটি ভাবগত সাদৃশ্য দেখেন।
নজরুলকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার প্রসঙ্গ:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন আবদুল হাই শিকদার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নজরুলকে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া, কবিকে আর্মি ক্রেস্ট প্রদান এবং তাঁর মৃত্যুর পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জানাজা শেষে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান, বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধান কবির মরদেহ কাঁধে বহন করে কবরস্থানে নিয়ে যান। পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ‘নজরুল র্যালি’ প্রবর্তন এবং এতে নিজে অংশ নেওয়া, দোয়েল চত্বর থেকে মহাখালী সড়কের নাম ‘কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ’ করা এবং তাঁর শাসনামলে প্রথম ‘জাতীয় নজরুল সংগীত সম্মেলন’ আয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নজরুলের চেতনা ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ:
নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবমুক্তির চেতনার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর একটি ভাবগত সম্পর্ক রয়েছে বলেও মত দেন আবদুল হাই শিকদার। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ ছিল এবং স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় রক্ষার প্রশ্ন সামনে আসে। তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর মাধ্যমে সবার সমান স্বাধিকার নিশ্চিত করার যে ধারণা সামনে আনা হয়েছিল, তার সঙ্গে নজরুলের সাম্য ও মানবমুক্তির চিন্তার একটি যোগসূত্র রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান:
নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন আবদুল হাই শিকদার। তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারে নজরুলের রচনাবলির অন্তত একটি সেট থাকা উচিত। সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারে নজরুলের কোনো কবিতা বা নিবন্ধ পাঠের চর্চা করা যেতে পারে। তরুণদের নজরুলের মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, এসব মূল্যবোধ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নজরুলচর্চা এগিয়ে নিতে দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নজরুল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি। এসব কেন্দ্রে ‘নজরুল চেয়ার’-এর অধীনে উচ্চতর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার কথাও বলেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারে নজরুলের রচনাবলি পৌঁছে দেওয়া এবং নজরুল গবেষকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানান। আবদুল হাই শিকদারের মতে, নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সাহিত্য, সাংবাদিকতা, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও সমাজদর্শনের সামগ্রিকতার আলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার গভীর পাঠের মধ্য দিয়েই নজরুলচর্চাকে আরও গতিশীল ও অর্থবহ করা সম্ভব।









