শ্রমিক আন্দোলনের নামে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সময়: 7:56 am - November 2, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক :পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি জানান, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রম মন্ত্রণালয় যথাযথ প্রক্রিয়ায় গতকাল প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ বোর্ড গঠন করে। শিগগিরই বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতি তিন বছর অন্তর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা ও নির্ধারণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে কয়েক সপ্তাহ আগে বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নাম পেতে কিছুটা সময় লাগে। সর্বশেষ গত পরশু রাতে শ্রমিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দেয়।

মজুরি নির্ধারণের সময়সীমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্তমান মেয়াদের সময় রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের জীবনমান ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীও শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।

অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করার দাবি

শ্রমিক বিক্ষোভ ও সাম্প্রতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এসব ঘটনার পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।তিনি বলেন, কিছু শিল্পমালিকও এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য রয়েছে। আবার কিছু শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে এমন ব্যক্তিরা কাজ করছেন, যাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে তারা আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে জড়িত, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে।

শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, সরকার তা চায় না

সরকারের অবস্থান তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার শিল্প, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবান্ধব। রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।তিনি জানান, কিছু শিল্পকারখানা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ করা হয়েছে বলে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা সরকারের কাছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিল্পমালিকেরা। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহভাজন শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামও চাওয়া হয়েছে।মন্ত্রী বলেন, কোনো শ্রমিক বা প্রকৃত শ্রমিক সংগঠন নিজেদের কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানার ক্ষতি চাইবে না। তাই যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। ভুলক্রমে কেউ এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকলে তাদের সেখান থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।

শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বিকেলে বৈঠক

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সোমবার বিকেল ৩টায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবে সরকার। সকালে শিল্পমালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। উভয় পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং শিল্পের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।তিনি বলেন, শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে, একই সঙ্গে কোনো শ্রমিক যাতে কর্মহীন হয়ে না পড়েন, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকার কোনোভাবেই শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, তা চায় না।

২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে থাকবে সরকার

শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হবে।তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সরকারের ‘সুরক্ষা অ্যাপস’ ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান ও শেয়ার করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা প্রতিহত করা হবে

শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করা হবে। সীমান্তের ওপার থেকে ইঙ্গিত বা নির্দেশনায় কেউ অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করলেও তা বরদাশত করা হবে না বলে জানান তিনি।এ সময় কিছু শিল্পমালিকের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়েও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, অতীতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন—এমন কয়েকজন শিল্পমালিকও অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা রাখছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে।

ডিসেম্বর নিয়ে অযথা উদ্বেগ ছড়ানোর অভিযোগ

ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস। এ মাসে বিজয় দিবস উপলক্ষে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি থাকবে। পলাতক আসামিরা ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে কিছু করার চেষ্টা করলে সে বিষয়ে তাদেরই প্রশ্ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন, শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। তারা দেশে ফিরলে আইনের আওতায় এনে আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ডিসেম্বরকে ঘিরে অযথা উত্তেজনা তৈরি করে পলাতক নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করার চেষ্টা সফল হবে না। সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর