অনিয়মিত আবহাওয়ার চাপে বাড়ছে কৃষির অনিশ্চয়তা

সময়: 9:18 am - July 11, 2026 |

রুহুল আমীন মোল্লা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের ঋতুচক্রে ক্রমেই অস্বাভাবিকতা বাড়ছে। একদিকে মৌসুমের বাইরে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির অনুপস্থিতি ও খরা-এই দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি কৃষি খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার এই অস্থিরতা শুধু ফসলের উৎপাদন কমাচ্ছে না, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “কৃষি সম্পূর্ণভাবে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। যখন নির্ধারিত সময়ে বৃষ্টি হয় না কিংবা ফসল কাটার মৌসুমে অতিবৃষ্টি হয়, তখন উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অনিশ্চয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।” তাঁর মতে, অভিযোজনমূলক কৃষি প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। রাজশাহীর কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “বীজ বপনের সময় বৃষ্টি পাওয়া যায় না, আবার ধান পাকলে হঠাৎ কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে জমি ডুবে যায়। এতে এক মৌসুমের পরিশ্রম অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।” নওগাঁর কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, “খরা দীর্ঘ হলে সেচের জন্য বেশি খরচ করতে হয়। কিন্তু পরে অতিবৃষ্টি হলে সেই ফসলও ঠিকমতো ঘরে তোলা যায় না।”

কৃষি অর্থনীতিবিদ ডক্টর নাজমুল হক বলেন, “আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তার কারণে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে। উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ কমে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়ে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ধান নয়, গম, ভুট্টা, ডাল, পাট, শাকসবজি এবং ফলের উৎপাদনও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি গবেষক ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “অতিরিক্ত তাপমাত্রা পরাগায়ন ব্যাহত করে, আবার অতিবৃষ্টি শিকড়ের ক্ষতি করে। ফলে ফলন এবং ফসলের গুণগত মান-দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর শারমিন আক্তার বলেন, “কৃষি উৎপাদন কমে গেলে শুধু অর্থনীতি নয়, পুষ্টি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। খাদ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ কমে যেতে পারে।” চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, “সবজির দাম এখন খুব দ্রুত ওঠানামা করে। কখনো অতিবৃষ্টির কারণে দাম বাড়ে, আবার কখনো খরার কারণে বাজারে পণ্য কম আসে।” পাবনার কলেজশিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “কৃষকদের সমস্যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজের ওপর পড়ে। তাই কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করা খুবই প্রয়োজন।” পরিবেশবিদ ডক্টর সায়মা রহমান বলেন, “বন উজাড়, জলাধার ভরাট এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারও স্থানীয় আবহাওয়ার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় খরা ও জলাবদ্ধতা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, আধুনিক সেচব্যবস্থা, আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরামর্শ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃষি বীমা এবং কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জলবায়ু নীতিবিদ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “কৃষি খাতকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা করলেই হবে না। পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম এমন একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।” বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার যুগপৎ প্রভাব দেশের কৃষি খাতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। সময়মতো বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কৃষিবান্ধব নীতি এবং কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন বাস্তবায়ন করা গেলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। অন্যথায় কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর