Glow Touch বিউটি পার্লার ঘিরে প্রশ্ন: সৌন্দর্যসেবায় চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

সময়: 11:47 am - July 28, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় বিউটি পার্লার ও অ্যাসথেটিক সেন্টারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সৌন্দর্যচর্চার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এ খাতে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত। তবে সৌন্দর্যসেবার নামে গ্রাহকের নিরাপত্তা, পণ্যের মান, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, বিজ্ঞাপনের সত্যতা এবং কর-ভ্যাট পরিশোধের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। রাজধানীর পান্থপথে ‘Glow Touch’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণাকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেগুলোও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন। তবে কোনো অভিযোগকেই তদন্তের আগে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং প্রয়োজন নথিপত্র যাচাই, সরেজমিন পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় Laser Hair Removal, Permanent Tattoo, Mole Remove, Permanent Lip Colour, Permanent Eyebrows, Hydra Facial, BB Glow Facial, Hair Extensionসহ বিভিন্ন সেবার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ‘Aesthetic and Training Center’ পরিচয় ব্যবহার করে স্কিন, হেয়ার, লেজার ও মেকওভার বিষয়ে প্রশিক্ষণের কথাও প্রচার করা হচ্ছে।

এখানেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। এসব সেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, লেজার মেশিন ও অন্যান্য উপকরণ যথাযথ মানসম্পন্ন কি না, সেগুলো বৈধভাবে আমদানি বা সংগ্রহ করা হয়েছে কি না এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য জনবল রয়েছে কি না—তা যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে শরীরের ত্বক, ঠোঁট, চুল বা অন্যান্য সংবেদনশীল অংশে সরাসরি প্রয়োগ করা সেবার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। ব্যবহৃত প্রসাধনী ও সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যগুলো বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)-এর প্রযোজ্য মান, অনুমোদন ও অন্যান্য আইনগত শর্ত পূরণ করছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা উচিত।

ঠিকানা নিয়েও অসঙ্গতির অভিযোগ:

Glow Touch-এর ঠিকানা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় এক ধরনের ঠিকানা ব্যবহার করা হলেও অন্য একটি অনলাইন তথ্যসূত্রে ঠিকানাটি ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।  প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে ঠিকানা হিসেবে “44/AF/8A, Level-5, Panthapath, Dhaka”যোগাযোগ: ০১৭৯৬-৫৮৭৯৬০,  ধরনের তথ্য উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।   অন্যদিকে, আরেকটি অনলাইন তথ্যসূত্রে “৪৪/এফ/৮এ, পান্থপথ, ঢাকা, ঠিকানা পাওয়া গেছে।

ঠিকানার এই পার্থক্য বাস্তব কোনো অসঙ্গতি, নাকি একই স্থানের ঠিকানা লেখার ভিন্ন ধরন—তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নথি এবং বাস্তব কার্যালয়ের ঠিকানা মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অনলাইন প্রচারণা, সরকারি নথি ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। এতে একদিকে গ্রাহকের বিভ্রান্তি কমবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিচয় ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে।

আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনুমোদন আছে কি?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠানটি যে ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সেটি আবাসিক নাকি বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত?যদি ভবনটি আবাসিক হিসেবে অনুমোদিত হয়ে থাকে, সেখানে বিউটি পার্লার বা অ্যাসথেটিক সেন্টারের মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রে ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুমোদন পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

‘Aesthetic and Training Center’ পরিচয় নিয়েও স্বচ্ছতা জরুরি:

প্রতিষ্ঠানটি যদি শুধু বিউটি পার্লার হিসেবে নয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, তাহলে প্রশিক্ষণের বৈধতা ও সনদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের জন্য কোনো নিবন্ধন বা অনুমোদন প্রয়োজন হলে তা নেওয়া হয়েছে কি না, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা কী, প্রশিক্ষণের সিলেবাস কী এবং প্রশিক্ষণ শেষে দেওয়া সনদ কোনো সরকারি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রহণযোগ্য কি না—এসব তথ্যও গ্রাহকদের সামনে পরিষ্কার থাকা উচিত।

গ্রাহকের ছবি-ভিডিও ব্যবহারে সম্মতি কতটা নিশ্চিত?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহকদের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্পষ্ট সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সৌন্দর্যসেবা গ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির ছবি তার অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক প্রচারণায় ব্যবহার করা হলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছে কি না, দেখবে এনবিআর:

ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে রাজস্ব পরিশোধের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ করছে কি না, ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে কি না, গ্রাহকদের যথাযথ চালান দেওয়া হচ্ছে কি না এবং ব্যবসার প্রকৃত আয় কর নথিতে সঠিকভাবে দেখানো হচ্ছে কি না—এসব বিষয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যাচাই করা প্রয়োজন। এটি শুধু Glow Touch-এর ক্ষেত্রে নয়; রাজধানীতে গড়ে ওঠা সব বিউটি পার্লার ও অ্যাসথেটিক সেন্টারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

অভিযোগ নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ যাচাই:

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। একইভাবে অভিযোগ উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। Glow Touch-এর ক্ষেত্রে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই, সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় তদন্ত করা উচিত। তদন্তে কোনো অনিয়ম না পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানও পরিষ্কার হবে। আবার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। আমরা মনে করি, সৌন্দর্যসেবা মানুষের প্রয়োজন ও পছন্দের একটি বৈধ খাত। কিন্তু এই খাতের বিকাশ হতে হবে স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কর-জবাবদিহিতার ভিত্তিতে। শুধু চমকপ্রদ ফেসবুক বিজ্ঞাপন নয়—একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত তার বৈধ কাগজপত্র, মানসম্মত সেবা ও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণের মাধ্যমে।

তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন একটাই—রাজধানীর বিউটি পার্লার ও অ্যাসথেটিক সেন্টারগুলোর এসব বিষয় নিয়মিতভাবে যাচাই হচ্ছে তো?

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর