দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে মাইনাস প্রবৃদ্ধি, চাপে এনবিআর

সময়: 11:21 am - September 13, 2026 |

তাহের মাহমুদ:

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতি এবং রাজস্ব নীতির কিছু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আহরণে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। বিশেষ করে ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। বিপরীতে আয়কর খাতে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও তা সামগ্রিক ঘাটতি পূরণ করতে পারেনি। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে জুলাই-আগস্ট সময়ে এনবিআর মোট ৫১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা আদায় করেছে। ফলে দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এ সময়ে এনবিআরের গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আহরণে এমন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি উদ্বেগের বিষয়। এমনকি করোনা মহামারির সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা থাকলেও এ ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।

প্রথম দুই মাসে এনবিআরের তিনটি অনুবিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে ভ্যাট খাতে। জুলাই-আগস্টে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। এ সময়ে ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এবং তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ার কারণে এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। অনেক ব্যবসায়ী এখনো রিটার্ন জমা না দেওয়ায় প্রত্যাশিত সময়ে ভ্যাটের অর্থ সরকারি কোষাগারে আসেনি। এ বিষয়ে এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, সাধারণত রিটার্নের সঙ্গে ভ্যাটের অর্থ জমা পড়ে। বাধ্যবাধকতা না থাকায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে এখনো রিটার্ন জমা দেয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভ্যাট পাওয়ার কথা ছিল। তিনি আরও জানান, তামাকজাত পণ্যের খাত থেকেও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব এসেছে। সব মিলিয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ও তামাক খাত থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ভ্যাট এখনো পাওয়া যায়নি। এর প্রভাব সামগ্রিক ভ্যাট আহরণে পড়েছে।

ভ্যাটের পাশাপাশি কাস্টমস খাতেও রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রথম দুই মাসে কাস্টমস খাতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা। এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কাস্টমস খাতে রাজস্ব আদায়ের গতি কমার পেছনে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকা, ছোট ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগ এবং উল্লেখযোগ্য বড় ধরনের পণ্য বা পণ্যের চালান শনাক্ত করতে না পারাসহ বিভিন্ন বিষয় রাজস্ব আহরণে প্রভাব ফেলছে বলে তাঁদের ধারণা। কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউসের ব্যবস্থাপনা ও তদারকির ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো গেলে রাজস্ব আহরণের গতি কিছুটা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা। তবে কাস্টমস খাতে প্রথম দুই মাসে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ১৪ শতাংশ ইতিবাচক থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে।

রাজস্ব আহরণের সামগ্রিক চিত্রে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে আয়কর অনুবিভাগ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আয়কর খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৬ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। ফলে এই খাতেও ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। তবে ঘাটতি থাকলেও আয়কর খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য বছরজুড়ে সুযোগ থাকায় এই খাতে রাজস্ব আহরণের গতি তুলনামূলক ভালো রয়েছে। এনবিআরের সামগ্রিক রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির কারণে অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ভ্যাট রিটার্ন জমা এবং রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় তদারকি জোরদার এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তাঁরা। অর্থবছরের বাকি সময়ে রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে প্রাথমিক দুই মাসের বড় ঘাটতি কতটা পূরণ করা সম্ভব হবে, এখন সেটিই এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর