জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোর ৬টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের বহনকারী তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বাসসকে জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথম অংশগ্রহণ। ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায়:
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএমএম সালেহ শিবলী বাসসকে জানান, তুর্কি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি সকাল ৬টা ৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। প্রায় ৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের যাত্রা শেষে বিমানটির তুরস্কের স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। সেখানে ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের ট্রানজিট শেষে ফ্লাইটটি দুপুর ২টা ১০ মিনিটে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটি জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। পরে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রালে নেওয়া হবে। সফরকালে তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এটি জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক ফোরামে তাঁর প্রথম বক্তব্য। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচি অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। অধিবেশনের এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে বিশ্বনেতারা বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন।
২২ সেপ্টেম্বর ব্যস্ত কর্মসূচি:
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের দেওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেবেন। সন্ধ্যায় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জলবায়ু, বৈশ্বিক বৈষম্য ও রোহিঙ্গা সংকট:
২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি প্রাতরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা’ বিষয়ক সভায় বক্তব্য দেবেন তিনি। একই দিনে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সংগত উত্তরণ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও যোগ দেবেন। এ ছাড়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু সংক্রান্ত বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশকে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বৈঠক:
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সূচিতেও ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের হুমকি মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা উল্লেখ রয়েছে। একই দিনে বাংলাদেশ আয়োজিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এর মধ্যে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষ ও পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার গুরুত্ব তুলে ধরবেন তিনি।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে তারেক রহমানের। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। তিনি ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও গুরুত্ব:
প্রধানমন্ত্রীর সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সফরকালে মেটা, ওয়াল স্ট্রিট এবং কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠনের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক অংশীদারত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার কথা:
সফর শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এদিকে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকার ও অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির বিভিন্ন কর্মসূচিতেও বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।








