জুলাই সনদ ‘পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে’ ডেপুটি স্পিকারের পদ নেবে জামায়াত
মানব কথা: জুলাই সনদ ‘পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে’ তখনই সংসদের বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকারের পদ নেবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে সংসদ ভবনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যদের বৈঠকের পর এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, তারা (সরকারি দল) নন অফিশিয়ালি আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন, কথা বলেছেন আমরা তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই, জুলাই সনদের যে সংস্কার প্রস্তাব, সেই প্রস্তাবটা পুরাপুরি বাস্তবায়ন হোক। এর আলোকে বিরোধী দলের যতটুকু পাওনা, আমরা অতটুকু চাই। বেশি চাই না, ওই প্রস্তাবেই আছে যে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই প্যাকেজ। আমরা চাই পুরাটাই সেখানে গ্রহণ হোক, বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের কোনো সিদ্ধান্ত সভায় নিয়েছে কিনা–তা জানতে চান একজন সাংবাদিক।
জবাবে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, হ্যাঁ আমরা অনেক আলাপ আলোচনা করেছি এই ব্যাপারে। কালকে আমাদের ভূমিকা আপনারা দেখবেন। যেমন সূর্য উঠবে, তখন ভাষণ শুনবেন এবং আমাদের ভূমিকা দেখবেন।
বেলা সাড়ে ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় বিরোধী দলের সভা কক্ষে সংসদীয় দলের সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন শফিকুর রহমান।
পরে সংসদের এলডি হলে ব্রিফিংয়ে আসেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর এমপি এটিএম আজহারুল ইসলাম, মজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কী হবে তা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা বিরোধী দলের সমস্ত সংসদ সদস্যরা বসেছিলাম। জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দেশ এবং জাতির জন্য আমাদের ভূমিকা কী হবে এবং সেই ভূমিকা তো আগামীকাল থেকেই শুরু হবে, সে ব্যাপারেই আমরা মূলত পরামর্শের জন্য বসেছিলাম। আমরা কথা বলেছি, মতামত নিয়েছি, পরামর্শ নিয়েছি। আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর বা অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। ইতোমধ্যে আমরা ঘোষণা করেছি, বিরোধী দল হিসেবে আমরা একটা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই। সকল ব্যাপারে বিরোধিতা নয়, আবার না বুঝেও কোনো সহযোগিতা নয়। দেশ এবং জাতির কল্যাণে সরকারি দলের গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন থাকবে, সহযোগিতা থাকবে।
শফিকুর রহমান বলেন, কিন্তু দেশ এবং জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব। প্রথমে ভুল করলে আমরা ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে যদি কাজ না হয় তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াব। আমরা চাই যে প্রথমটায় কাজ হোক, দ্বিতীয়-তৃতীয়টা-চতুর্থটার কোনো প্রয়োজন যেন না হয়। এটা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে সরকারের সদিচ্ছার উপরে, যেহেতু তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কোনো কিছু করতে চান, পারবেন। কিন্তু যদি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয়গুলাকে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য উত্তম।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, আমরা দেশের মানুষের কল্যাণ চাই, আমরা প্রিয় দেশের ভালো চাই। যে কাজ আমরা করতাম, সেই কাজ তারা করলে করতে দিতে হবে। আরো নতুন নতুন কাজ আমরা খুঁজে বের করব এবং সবাই মিলেই দেশ এবং সমাজটাকে সুন্দর করব। আমরা আশা করব দুর্নীতি আর দুঃশাসনের করাল গ্রাসে বাংলাদেশ নতুন করে আর পড়বে না। যদিও দুর্নীতি এখনো আমাদের সমাজের প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা সবাই জানি। ইতোমধ্যে সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা আশা রাখব, জনপ্রত্যাশা সামনে রেখে বিশেষ করে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সরকার তার কার্যক্রম গ্রহণ করবে, যা জাতি এবং দেশকে উপকৃত করবে। এর পক্ষে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট এবং আমরা এ অবস্থান অব্যাহত রাখব। সবাই মিলেই আমরা আগামীর একটি নিরাপদ, একটি মানবিক দুর্নীতি এবং দুর্নীতি ও দুঃশাসন বাংলাদেশ গড়ব ইনশাআল্লাহ।
জাতীয় সংসদ ও গণভোটের ফলাফলের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দুটা ফলাফলই মেনে নিয়েছি। একটি নির্বাচনকে আলাদা করে আরেকটি থেকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দুটি আরেকটি সম্পূরক। প্রথম ফাংশন শুরু হবে নির্বাচিত সদস্যদের সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং তারও কিছু মেয়াদ উল্লেখিত আছে। এই কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পরে অটোমেটিক্যালি তারাই আবার সংসদ সদস্য হিসেবে অংশ।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অধ্যাদেশকে ‘সম্মান দেখিয়ে’ জামায়াত ও শরিক দলের এমপিরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদাভাবে শপথ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
কিন্তু বিএনপি যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি, সে বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা তাদের প্রতি আহ্বান জানাব, আসুন জুলাইকে সম্মান করি। জুলাইকে সম্মান করলে, ২৪ থাকলেই ২৬ হবে। নইলে ২৬ এর অস্তিত্ব থাকে না। ২৪ কে অমান্য অগ্রাহ্য করে পাশ কাটিয়ে ২৬ এ জাতির জন্য কোনো সুখবর নয়।
শফিকুর রহমান বলেন, তারা (সরকারি দল) শপথ নেননি। আমরা আশা করতে চাই, তারা (শপথ) নিয়ে এ কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করবেন। তাহলে ২৪ এর এত জীবনদান, এত শাহাদাত, এত পঙ্গুত্ব, এতো আহত–তার সার্থকতা পাবে। মনে রাখবেন, যারা ভোট প্রয়োগ করেছেন, তাদের ৬৯ ভাগ মানুষ এর (গণভোটে হ্যাঁ ) পক্ষে রায় দিয়েছে। এটাকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা এর পক্ষে ভূমিকা রেখে যাব এবং আমরা চাইব যে চারটি বিষয় গণভোটে দেওয়া হয়েছিল তার সবগুলো হুবহু গ্রহণ করা হোক, বাস্তবায়ন করা হোক। আমাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে ইনশাল্লাহ।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা এটা স্থির করেছি যে, আমরা অবশ্যই অপ্রাসঙ্গিক কোনো ভূমিকা রাখব না। আমরা প্রাসঙ্গিক ভূমিকা রাখব। আমরা আগেই বলেছি বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, সহযোগিতা করতে হলে সেটা দেশ এবং মানুষের জন্য। আর বিরোধিতাও করতে হলে দেশ এবং মানুষ অধিকারের জন্য। এ লড়াই ইনশাআল্লাহ আমরা সংসদে করব। প্রয়োজনে এই লড়াই রাজপথেও হবে… এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে হুটহাট করে আদালতে যাওয়াটা আমরা সহজে দেখব না একান্ত বাধ্য না হলে। আমরা যদি একান্ত বাধ্য হই, তাহলে হয়তবা আমরা আদালতের আশ্রয় নিতে পারি কোনো কোনো বিষয়ে। তা আমরা প্রথমে এগুলো প্রেডিক্ট করতে চাই না।
শফিকুর রহমান বলেন, প্রথমে চাই যে, সকল ব্যাপারে সংসদের যিনি অভিভাবক, যিনি সভাপতিত্ব করবেন, স্পিকার মহোদয়, তিনি ইনসাফ করবেন। বিরোধী দলকে যথেষ্ট সুযোগ দেবেন। তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য শুধু ফুটে উঠবে না, গণতন্ত্র টেকসই হবে। যে গণতন্ত্রটা এখনো বাংলাদেশ পায়নি। আমরা প্রত্যাশা করতে চাই, এই ত্রয়োদশ সংসদের মাধ্যমে সেটা যেন বাংলাদেশ পায়। আপনাদের (গণমাধ্যম) সহযোগিতা অব্যাহতভাবে আমরা কামনা করি এবং আমরা যাতে একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে ১১ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আমরা দায়িত্ব পালন করতে পারি। আপনারা দোয়া করবেন, সহযোগিতা করবেন।

















