‘তার চোর’ আনোয়ার? যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির নাম ব্যবহার করে আড়াল করার চেষ্টা

সময়: 1:49 pm - March 29, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক: ১২ মার্চ ২০২৬ খ্রিঃ ,বৃহস্পতিবার জাতীয় সং সদের প্রথম অধিবেশনে মূল সাউন্ড সিস্টেমে বিভ্রাট দেখা দিলে তা নিয়ে দেশ ব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দিতে গিয়ে দেখেন মাইক কাজ করছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তাকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়। স্পিকার তখন বলেন, “যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে কথাবার্তা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে না। সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।” পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর বেলা দেড়টার দিকে পুনরায় অধিবেশন শুরু হয়। তখন স্পিকার জানান, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সাময়িকভাবে অধিবেশন মুলতবি করতে হয়েছিল। এরপর তিনি তার বক্তব্য শুরু থেকে আবার দেন। এনিয়ে কয়েকজন সাংসদ গণমাধ্যমের কাছে খোভ প্রকাশ করেন। এ নিয়ে প্রায় সকল জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পায়। দায়ী দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগে সংসদ ভবনে এসি, আলো, মাইক্রোফোন ও অডিও সিস্টেম সংযোজনের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৩ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করে গণপূর্ত বিভাগ। তবে যাচাই-বাছাই শেষে এই প্রকল্পের জন্য ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এই প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয় সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক পি-রেশাস কমিউনিকেশনসের প্রতিষ্ঠাতা এবং গ্রুপ সিইও লারস ভিডেক্যামকে। তিনি কৌশলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ২০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞ। প্রকল্প পরামর্শকের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সংসদ ভবনের পুরো সাউন্ড সিস্টেম পরিবর্তন না করে শুধুমাত্র লুট হওয়া যন্ত্রাংশ পুনস্থাপন করে শব্দ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। মেরামত না করে যদি সাউন্ড সিস্টেম পুনঃস্থাপন করতে চাইলে ওজনে হালকা এবং কনফারেন্সের জন্য উপযোগী হেডফোন সংযোজন করতে হবে। যদিও লারস ভিডেক্যামের মতো একজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞের এই পরামর্শ আমলেই নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সূত্র মতে, সংসদ ভবনে হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। একেকটি গুজনেক মাইক্রোফোনের দাম ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং হেডফোনের দাম প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। অতীতের ন্যায় এবারও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় অডিও ব্র্যান্ড ‘শিওর’-এর তৈরিকৃত হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন বসানো হয় সংসদে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনভিজ্ঞ ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করানোর কারণেই সংসদ ভবনে শব্দ বিভ্রাটের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। তারা ঠিকমতো হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপন করতে পারেনি। তাদের এই গাফিলতির কারনে মাত্র দুই দিনের অধিবেশনেই এমপিরা অস্বস্তিতে ভুগেছেন। ফলশ্রুতিতে এখন সকল হেডফোন পরিবর্তন করতে হবে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। এতে গচ্চা যাবে রাষ্ট্রের অর্ধকোটি টাকা। এদিকে, অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাই স্বীকার করেছেন। কিন্তু অনভিজ্ঞ ঠিকাদারের উপর দায় চাপিয়ে পার পেয়ে যাবার সুযোগ নেই। কেননা কি জিনিস বুঝে নেবেন সে সকল পন্য ও সরবরাহ সেবা(Goods and related service) ক্রয়ে প্সেসিফিকেশন ঠিক করে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর, সে মোতাবেক পন্য বুঝে নেয়াও তাদের দায়িত্ব। তাই এক্ষেত্রে কারিগরী অনুমোদন যারা দিয়েছেন তারা দায় এড়াতে পারেন না। উপরন্তু আমানত এন্টার প্রাইজ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কে সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কাজ দিয়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। তাই পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন ও ক্রয়কার্য অনুমোদন এর সাথে জড়িত সকলেরই অর্থাৎ ঢাকা গণপূর্ত ইএম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, ইএম সার্কেলে-৩ এর তত্তবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, গণপূর্ত ইএম বিভাগ-৭ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন এর দায় রয়েছে। সেই সাথে কাজ তদারকির সাথে সম্পৃক্ত আরও দুই প্রকোশলী আসিফুর রহমান ও সামসুল ইসলাম এর দায় রয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন এর দূর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থলূটের ইতিহাস নতুন নয়। এর আগে ঢাকা ই এম বিভাগ ৫ এ থাকা কালীন ইচ্ছেমতো ডিপিপির ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্যাকেজ ভেঙ্গে পছন্দের ঠিকাদার কে সামনে রেখে নিজে ব্যবসা করেছেন। প্রকল্পের কাজে বারোটা বাজিয়ে যখন খুশি তখন কাজ শেষ করতেন। তার অপকর্মের কারনে প্রত্যাশী সংস্থা নানা বিধ তদন্ত কমিটি করে, ফলে তার কারনে বার বার অধিদপ্তরের মাথা হেট হয়েছে। অসংখ্য অভিযোগ আর লাগামছাড়া দূর্নীতির কারনে তাকে পিএন্ডডিতে বদলী করা হয়েছিলো। সেখান থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর আশরাফুল হক সহ পুনরায় গুরুত্বপূর্ন পদে প্রত্যাবর্তন করেন। এই মানিক জোড়ের সাথে আমানত এন্টার প্রাইজের কর্নোধার দুলাল এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আশরাফুল হকের এই কুকীর্তি নতুন নয়, এর আগেও ২০১৮ সালে সংসদ ভবনের তিনি দায়িত্বে থাকা কালে অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল। সেযাত্রায় শাস্তি মূলক বদলী পেলেও, কয়েক দিনের মধ্যে সবকিছু ম্যানেজ করে আবার চলে আসেন।

এত অনিয়মের পরও নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুব, গণমাধ্যমে গর্ব ভরে বলে বেড়াচ্ছেন যুক্ত রাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ব্রান্ডের হেড ফোন দিয়েছেন,তাদের কোন গাফিলতি নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এরকম বড় এস্যাম্বলীতে সাউণ্ড সিস্টেমে বিভ্রাট শুধু তথা কথিত গুজনেক হেড ফোনের কারনে ঘটেছে এমন টা নিশ্চিত হলেন কি করে? আমরা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে একটা ধারনা পেয়েছি যে এই ধরনের বড় ও জটিল প্রক্রিয়ার সাউন্ড সিস্টেম নিরবিচ্ছিন্ন রাখার জন্য বিশেষায়িত, XLR Audio Cables; TRS (Tip, Ring, Sleeve) cable; TS (Tip, Sleeve) cables; Speakon cables; Speaker Cables / Banana Plugs; RCA cables; S/PDIF (Sony/Philips Digital Interface) cables তার প্রয়োজন হয়। তাছাড়া বিভ্রাট এড়াতে এই কেবল সমূহের কপার উন্নতমানের হতে হয়, ক্ষেত্র বিশেষে অক্সিজেন ফ্রি কপার, সিলভার প্লেটেট কপার থাকতে হয়। তাছাড়া সাউন্ড নিরবিচ্ছিন্ন থাকতে এই কেবল সমূহে কোন জোড়া থাকবে না। আমরা নিশ্চিত এখানে আনোয়ার বিপুল পরিমান তার চুরি করতে জোড়া দিয়েছে, এবং স্ট্যান্ডার্ড গ্রেডের কপার কেবল ব্যবহার না করে নিম্ন মানের তার ব্যবহার করেছে। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ন স্থানে কেবল ব্যবহারের পূর্বে করা হয়নি কোন পরীক্ষা। আমরা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি আনোয়ার তার কেবলের কোন বুয়েট পরীক্ষিত টেষ্ট রিপোর্ট দেখাতে পারবেনা। উলটো তারের বিষটি উপেক্ষিত রেখে, বার বার হেড ফোনের বিষয়টি মিডিয়াতে এনে অপরাধ ধামা চাপা দিতে চাইছে। আমরা খুব অবাক হয়ে লক্ষ করেছি, এ বিষয় নিয়ে একশটির মতো গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও বর্তমানে দ্যি ডেইলি স্টার, দৈনিক মানব কথা সহ হাতে গোনা কয়েকটি মিডিয়া ছাড়া অধিকাংশই তাদের অন লাইন ভার্সন থেকে এ সংক্রান্ত নিউজ সড়িয়ে নিয়েছে। জন শ্রুতি আছে, আনোয়ার-মাহাবুব-আশরাফ গং নাকি ঈদের আগে দুই কোটি টাকা ঢেলে মিডিয়ার মুখ বব্ধ করেছেন। কিন্তু জনগনের করের টাকা এভাবে গচ্চা দেয়া আমরা মেনে নিতে পারিনা। আমরা মনে করি যথাযথ কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন কাউকে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর