ফ্যামিলি কার্ডের ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ে সংসদে হাসনাতের প্রশ্ন

সময়: 10:35 am - April 29, 2026 |

মানব কথা: ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডে বড় অঙ্কের সরকারি ব্যয় অর্থনীতিকে কতটা স্বনির্ভর করবে এবং তাতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে কি না, সেই প্রশ্ন জাতীয় সংসদে তুলেছেন কুমিল্লা ৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, চার কোটি পরিবারকে একবারে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না; ধাপে ধাপে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আগে দিয়ে এই কর্মসূচি চালানো হবে।

তাতে বাজেটের ওপর বড় ‘চাপ পড়বে না’ এবং মূল্যস্ফীতি ‘বাড়বে না, বরং কমবে’ বলে সরকারপ্রধানের ভাষ্য।

বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের সম্পূরক প্রশ্নে এ আলোচনা হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

এর আগে টাঙ্গাইল ৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়ালের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী নারী, শিশু, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। ওই উত্তরের প্রেক্ষিতেই সম্পূরক প্রশ্ন করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আগেই বলেছেন মোট চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। তাতে বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। প্রক্রিয়াগত ব্যয়সহ তা ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে।”

গত সপ্তাহে ঘোষিত ফার্মার্স কার্ড কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন হাসনাত। তিনি বলেন, “২ কোটি ৭ লাখ কৃষককে ফার্মার্স কার্ডের আওতায় আনলে প্রায় ৬ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লাগবে, যা প্রক্রিয়াগত ব্যয়সহ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকায় যাবে।”

এই পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে মানুষকে সংযোগ করেছে, মানুষ সেগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্নটি হচ্ছে, আমরা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রত্যেক বছর যদি একটা নির্ভরশীল অর্থনীতির খাতে বিনিয়োগ করি, সেক্ষেত্রে এটা কতটা আমাদের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করবে?”

এ অর্থ বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির খাত থেকে কেটে এনে দেওয়া হবে, নাকি নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হবে, তাও জানতে চান এনসিপির এই এমপি।

হাসনাতের প্রশ্ন ছিল, “যদি নতুন করে দিই, সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা, এটি পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা?”

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনের আগে যে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলা হয়েছিল, মানুষ তা গ্রহণ করেছে এবং এর চাহিদাও তৈরি হয়েছে।”

হাসনাতকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আপনার নির্বাচনী এলাকাতেও আপনাকেও মহিলারা ঘিরে ধরেছিল ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য। আপনি উত্তরে বলেছেন, যেই মুহূর্তে ফ্যামিলি কার্ড সরকার দেবে, আপনি চেষ্টা করবেন তাদেরকে ফ্যামিলি কার্ড ডিস্ট্রিবিউট করার জন্য।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “চার কোটি পরিবারকে একবারে কার্ড দেওয়া পৃথিবীর কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই ডেটাগুলো কালেক্ট করতে হবে, কার কী অবস্থা, প্রত্যেকটা ফ্যামিলির ডেটা কালেক্ট করবে। পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা দেব এবং প্রথম স্টেজে আমরা যারা ভালনারেবল ফ্যামিলি, আমরা তাদেরকে এই কার্ডগুলো দিব।”

ধীরে ধীরে বাজেট তৈরি করে কার্ডধারীর সংখ্যাও ধাপে ধাপে বাড়ানো কথা বলেন সরকারপ্রধান।

হাসনাতের উদ্বেগের জবাবে তিনি বলেন, “সরকারের হিসাব অনুযায়ী এ কর্মসূচির কারণে বাজেটের ওপর এমন কোনো চাপ পড়বে না, যা বড় সমস্যা তৈরি করবে। আমাদের যেসব হিসাব-নিকাশ করেছি, তাতে করে বাজেটের উপরে কোনো চাপ পড়ার তেমন কোনো কারণ নেই।”

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে এই নতুন কার্ডভিত্তিক সহায়তার দ্বন্দ্ব হবে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে যে বিভিন্ন ধরনের ‘সেইফটি নেট’ কর্মসূচি চালু আছে, সেগুলোর মোট সুবিধা যোগ করলেও একজন ব্যক্তি ফ্যামিলি কার্ডের আড়াই হাজার টাকার বেশি পান না।”

তিনি বলেন, “ফ্যামিলি কার্ডে যে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে, টাকার পরিমাণে সেটা সবচেয়ে বেশি।”

সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছেন। সে বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা কাটডাউন করব, সবগুলোকে আমরা কাটডাউন করব না, যেগুলো রিপিটেশন হচ্ছে সেগুলোকে আমরা কাটডাউন করব। এভাবেই করে আমরা ধীরে ধীরে নিয়ে যাব।”

মূল্যস্ফীতির আশঙ্কার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা অবশ্যই টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না। আমরা টাকা ছাপিয়ে দেব না। বরঞ্চ আমরা মনে করি, এতে ইনফ্লেশনটা কমে আসবে।”

কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমবে, তার ব্যাখ্যায় তারেক রহমান বলেন, “ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাওয়া পরিবারগুলো সাধারণত ব্র্যান্ডেড বা আমদানিনির্ভর পণ্য কিনবে না; তারা প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যই কিনবে, যার বেশিরভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত।”

“কেউ বলেছে জামা কাপড় কিনবে। কেউ বলেছে বাচ্চার জন্য বই কিনবে। কেউ বলেছে ফ্যামিলির প্রয়োজনীয় জিনিস কিনবে। এই মানুষগুলো মুরগি, থালাবাসন, গামছা, বাচ্চার কাপড় বা বইয়ের মত পণ্য কিনবে, যেগুলো লোকালি প্রডিউস হয়।”

এর ফলে এই অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরেই ঘুরবে এবং স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা উপকৃত হবে বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী।

তার ভাষ্য, ওই অর্থ স্থানীয় শিল্পে যাবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়াবে।

“যেই দোকানে গিয়ে সদাই করবেন, জিনিসপত্র কিনবেন, সেই দোকানে আপনি খোঁজ করে দেখুন এখন হয়ত একজন হেল্পার আছে, তিন মাস পরে বা ছয় মাস পরে দেখবেন তার স্টাফ দুজন হয়ে গেছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই কার্ড রাষ্ট্রের এক ধরনের বিনিয়োগ, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্থানীয় শিল্পও গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।আমাদের হিসাব বলছে ইনফ্লেশন বরং কমবে, বাড়বে না,”।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর