তীব্র তাপপ্রবাহে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী-জলাধার, বাড়ছে পানি সংকটের শঙ্কা
মিজানুর রহমান:দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের পানির স্তর দ্রুত কমে যাচ্ছে। একসময় সারা বছর প্রবাহমান থাকা অনেক নদীতেই এখন জেগে উঠছে চর ও বিস্তীর্ণ বালুচর। এতে পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং জনজীবনে নতুন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশবিদ ও জলসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণে দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে। জলবায়ু গবেষক ড. মাহমুদা ফেরদৌস বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাষ্পীভবনের হার বেড়ে যাওয়ায় নদী ও জলাশয়ের পানি দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণে পরিবর্তন আসায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণও ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।ইতোমধ্যে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, যে নদীতে একসময় সারা বছর নৌকা চলত, এখন সেখানে হেঁটেই পার হওয়া যায়। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার কৃষক মিজানুর রহমান জানান, নদীর পানি কমে যাওয়ায় সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, ফলে কৃষি উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদুল করিম বলেন, নদীর প্রাণ তার প্রবাহ। পানি কমে গেলে শুধু নদী নয়, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায় এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মৎস্যজীবীরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাবনার জেলে সাইদুল ইসলাম বলেন, পানি কমে যাওয়ায় আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন বরিশালের এক মৎস্যচাষিও। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।অর্থনীতিবিদ ড. তানভীর আহমেদ বলেন, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি। নদীর প্রবাহ কমে গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. ফারহানা কবীরের মতে, নদী ও জলাশয়ের পানি কমে গেলে অনেক এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়বে।
পরিবেশবিদরা নদী খনন, অবৈধ দখল ও দূষণ রোধ, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র তাপপ্রবাহে নদী ও জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের সতর্কবার্তা। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।









