বেগমপাড়া কেবল কানাডাতেই নয়, আছে ভারতেও: গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের দেশে-বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ
শহিদুল ইসলাম: গণপূর্ত অধিদপ্তর এর নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল এঁর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অব্যহতভাবে দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, হয়েছে তদন্ত কমিটি। ভবন ভেঙ্গে পড়া, কাজ শেষ না করেই ডিপিপির টাকা শেষ করে দেয়ার ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির প্রমান থাকা সত্যেও তিনি বার বার পার পেয়ে গেছেন। ভারতীয় দূতাবাসের আশীর্বাদ পুষ্ট এই ইসকন নেতা নিজ ইচ্ছা মতো তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে দিত, মন্ত্রণালয়, দুদক, অধিদপ্তর কারো সাধ্যে ছিলোনা দ্বিমত করার। ২৪ তম বিসিএস এঁর এই কর্মকর্তা চাকুরি জীবনে, ২০২৪ এঁর গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে কখনো ঢাকার বাহিরে বদলী হননি। ২০২৪ এঁর নভেম্বরে নামকা ওয়াস্তে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত জোনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে ৬ মাস থেকে আবার ঢাকায় এসে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগকে ফিরিয়ে আনতে ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি সহ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতারা টাকা ছিটিয়ে ঝটিকা মিছিলে অর্থায়ন করছেন, পেশাদার প্রকৌশলীদের হেনস্তা করতে ফ্যাসিস্টের দোসর সাংবাদিক দিয়ে নানা বিধ বানোয়াট রিপোর্ট তৈরী করে হয়রানি করার মিশন নিয়ে নেমেছেন।পারিবারিক ভাবে আওয়ামী কানেকশন ও রেজাউল মোস্তফা কামালের মাধ্যমে দূর্নিতির হাতেখড়িঃ সর্নেন্দু পারিবারিক ভাবে আওয়ামীলীগ এঁর আদর্শের সৈনিক। তিনি নিজে ছাত্রলীগের পরীক্ষিত কর্মী ও ভারতীয় দূতাবাসের প্রশিক্ষিত ক্যাডার। তার ভাই বিশ্বজিৎ মণ্ডল খুলনা জেলা আওয়ামীলীগের নেতা। ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে তাকে প্রথমেই লিফট দেন কাদের চৌধুরী-টিপুমুন্সী-সুকৃতি বরন রায় গং।
ফলে সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে ঢাকা তেই পোস্টিং পান। এরপরে তিনি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসাবে প্রথমেই পোস্টিং পান ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ ৬ (হাইকোর্ট)। এডজাস্টমেন্ট মাস্টার হিসাবে তাকে পছন্দ করেন আরেক ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল মোস্তফা কামাল। রেজাউল মোস্তফা কামাল বুয়েটে তিতুমীর হল ছাত্রলীগের পেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি ১৫ বিসিএস এ গণপূর্ত ক্যাডারে যোগদান করেন, পরবর্তীতে ক্যাডার পরিবর্তন করে জনপ্রশাসনে ন্যস্ত হয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি সর্নেন্দুকে ইডেন গণপূর্ত উপবিভাগ ২ এ পোস্টিং করিয়ে দেন। দুজন মিলে বেনামে ঠিকাদারি করে কারিকারি টাকা কামিয়েছেন। সর্নেন্দু নিজেও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের ব্যানারে ২০২৪ এঁর ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের নির্বাচনে ঢাকা কেন্দ্রে সেন্ট্রাল কাউন্সিল মেম্বার হিসাবে নির্বাচন করেন, তার ব্যালট নম্বর ৮২। বিনা ভোটের জবরদস্তি ভাড়াটে গুন্ডাদের দিয়ে করা এই একতরফা নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নমিনেশন কিনতে পারলে যে বিজয় নিশ্চিত তা কারও অজানা নয়।
কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মান প্রকল্পে নিম্ন মানের কাজ নিয়ে বিস্তর অভিযোগঃ ইডেন থেকে টাকা কামিয়ে সর্নেন্দু ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ ৪ এ পোস্টিং বাগিয়ে নেন। কেননা সেখানে তখন ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ প্রকপ্ল নির্মান শুরু হয়। এই প্রকল্পে তৎকালীন পূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আব্দুল মান্নান এঁর এপিএস ইকবাল এঁর সাথে মিলে তিনি দূর্নীতির মহাউৎসব করেছেন। মাটি ভরাট না করেই বিল দিয়ে দিয়েছিলেন। তাছাড়া কনভিক্টেড প্রিজনার্স ব্যারাক, সাজা প্রাপ্ত বন্দী ব্যারাক গুলোর কাজ এত নিম্ন মানের হয়েছে যে নির্মান শেষ হওয়ার আগেই প্লাস্টার খসে খসে পড়ছিলো, ফাউন্ডেশনে ফাটল দেখা দেয়। আইএমইডি ও কারা কর্তৃপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করে পত্র দেয়। তাছাড়া তিনি আরেক সাবেক ছাত্র লীগ নেতা সীমান্ত, স্বেচ্ছা সেবক লীগ নেতা সাউথ বাংলা কন্স ট্রাকশন এঁর সাথে শেয়ারে ব্যাবসা করে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাজ শেষ না করে ডিপিপির পুরা অর্থ শেষ করে ফেলেন। ফলে প্রকল্প সমাপ্ত করতে অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং অস্বাভাবিক সময় বেশী প্রয়োজন হয়। তার সময়ে কেরানিগঞ্জ কারাগারের ছাদ ভেঙ্গে পড়ার খবর ছিলো একটি সাধারন ঘটনা। পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ ৪ এ পদায়নঃ এত বড় অনিয়ম ও দূর্নীতি করেও তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে প্রথমেই ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ ৪ এঁর মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে পোস্টিং পান। সেখানে গোপালগঞ্জের সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। স্বেচ্ছা সেবক লীগ নেতা কাউসার মোল্লা ও তার ভাগিনা হাসান মোল্লাকে এক চেটিয়া কাজ দিতে থাকেন। তাদের নিয়ে টেন্ডার সিণ্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করেন। আবুজর গিফারী কলেজ সংলগ্ন ২৮৮ ফ্ল্যাট প্রকল্পে বঙ্গ বিল্ডার্স, দেশ উন্নুয়ন, ডেল্টার সাথে টাকা ভাগ বাটোয়ারার ফলে প্রকল্পের কাজ ঝুলে যায় এবং নিম্ন মানের কাজ হয়। যার ফলে এলোটিরা এখনো ভোগান্তিতে রয়েছে। খিলগাঁও কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলের উর্ধ্বমূখী সম্প্রসারন কাজও তার হরিলূটের কারনে নিম্নমানের হয়েছে। এই ডিভিশনে অনিয়ম দূর্নীতি করে তিনি কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা কামিয়েছেন মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে।
সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের আশীর্বাদে নগর গণপূর্ত বিভাগে পদায়নঃ
‘অভিযোগের কাঠগড়ায় নগর গণপূর্ত বিভাগ : সংস্কার কাজে ভয়াবহ দুর্নীতি লুটপাট’ শিরোনামে যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।ঐ প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলকে ২০২৩ সালে একবার বদলি করেও তা কার্যকর করতে পারেনি গণপূর্ত অধিদপ্তর। এক সপ্তাহের মধ্যে বদলির আদেশ স্থগিত করাসহ উলটো প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নথি উপস্থান করা হয়। নজিরবিহীন ওই ঘটনা সংশ্লিষ্ট সবাইকে হতবাক করে। নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ২০২১ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে বিগ প্রাইজপোস্টিং খ্যাত রাজধানীর নগর গণপূর্ত বিভাগে পোস্টিং নিতে সক্ষম হন। তবে অব্যাহত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ ডিসেম্বর তাকে শেরপুর গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে তাকে পরদিন ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরসহ ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত বা স্ট্যান্ড রিলিজ করার কথা বলা হয়। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল স্বপদে টিকে যান। এমনকি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয় যে, ১৩ ডিসেম্বর পৃথক প্রজ্ঞাপনে স্বর্ণেন্দু শেখরকে বদলি করার আদেশ স্থগিত করতে বাধ্য হন প্রধান প্রকৌশলী। উপরন্তু বদলি আদেশ স্থগিত করার মধ্য দিয়েও বিষয়টি শেষ হয়ে যায়নি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-১ থেকে ১৪ ডিসেম্বর দুই পৃষ্ঠার নথি উপস্থাপন করে উলটো প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। এই নথির ৫নং কলামে আনীত অভিযোগে বলা হয়, স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের বদলি আদেশটি বাতিল করার বিষয়ে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর (বঙ্গ ভবন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির দপ্তর) থেকে মৌখিকভাবে প্রধান প্রকৌশলীকে বলা সত্ত্বেও তিনি আদেশটি বাতিল করার কোনো উদ্যোগ নেননি। ফলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করার বিষয়টি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল মর্মে প্রতীয়মান হয়। এজন্য ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করার কারণে এ ধারায় কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না মর্মে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য বলা যেতে পারে। শাখা থেকে উপস্থাপন করা প্রস্তাবটি এক ঘণ্টার মধ্যে হাতে হাতে স্বাক্ষর হয়ে প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। তবে প্রতিমন্ত্রী বিষয়টির অন্তর্নিহিত বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে প্রস্তাব অনুমোদন না করে নথিজাত করেন। আসলে পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের আশীর্বাদে তিনি এই পোস্টিং পেয়েছিলেন। বিনিময়ে তার পুত্র ইমন এঁর প্রতিষ্ঠান প্যারাডাইম আর্কিটেক্ট এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স , আরেক পুত্র সৌরভ কে এস এ এন্টার প্রাইজ ও তাসবীরুল ইসলাম অনুর প্রতিষ্ঠানের নামে ৪৫ কোটি টাকার কাজ না করিয়ে বিল দিয়ে দেন। ফলে অধিদপ্তর প্রথমিক তদন্তে এগুলোর সত্যতা পায়। কিন্তু গোপাল্গঞ্জের পূর্ত সচিব ও তার উত্তরসুরী কাজী ওয়াসিউদ্দীন এঁর প্রভাবে তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়। এই কাজ গুলো জোড়াতালি দিয়ে শেষ করতে সর্নেন্দু আরও ৩০ কোটি টাকা বকেয়া করেন। এভাবে মেরামতের নামে হরিলুট করে তিনি শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। সেই টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। সরকারি চাকুরি করে তিনি তিন সন্তানকে দামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ান কিসের জোরে?
এখনো এই ফ্যাসিস্টের প্রভাব প্রকটঃ তার বিরুদ্ধে ২৪ এঁর জুলাই গণহত্যায় সক্রিয় অংশ গ্রহন ও অর্থায়নের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। তার দূর্নীতির বিরুদ্ধে এ কে এম আসাদুজ্জামান সম্রাট, সাংবাদিক, ৯১ সিদ্ধেশ্বরী , রমনা, ঢাকার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে মন্ত্রনালয় ৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ২৫.০০.০০০০.১৩০.২৭.০০২.১৯-১২ স্মারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রেরনের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেয়। অধিদপ্তর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খিস্টাব্দে তদন্ত কমিটি গঠন করে ১০ কর্ম দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বললেও ৫ মাস অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয় নি। এই দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা টাকা ছিটিয়ে সব ম্যানেজ করে ফেলেন। অনিয়ম দূর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি কয়েকশত কোটি টাকা কামিয়েছেন, সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করেছেন। তিনি ভারতের চেন্নাই এঁর শংকর নেত্রালয় এঁর কাছে, কলকাতার সল্ট লেক, দিল্লীর নয়ডা এলাকায় বাড়ি কিনেছেন এবং মুম্বাই এঁর অভিজাত এলাকায় ১৫ কোটি রুপিতে বিলাস বহুল সী-ভিউ এপার্ট্ম্যান্ট কিনেছেন মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে। তিনি এখন ভোল পাল্টে নব্য বিএনপি সেজে প্রমোশনের পর ঢাকা সার্কেল ১ এ বসতে তদবীর করে যাচ্ছেন। অধিদপ্তর, দেশ সব জায়গায় অরাজকতা সৃষ্টি করে তাদের আপার আগমনের প্রহর গুনছেন এই ফ্যাসিস্ট। তার বিরুদ্ধে রাজস্ব গোয়েন্দা ব্যবহার করে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা এবং তার অবৈধ সম্পদ তদন্ত পূর্বক বাজেয়াপ্ত করার আহবান জানাচ্ছি।












