এনবিআরের আন্দোলনে শাস্তি পাওয়া ২০ কর্মকর্তার দণ্ড বাতিল
মিজানুর রহমান:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভাজন ইস্যুতে আন্দোলনের কারণে সাময়িক বরখাস্তের পর লঘুদণ্ড পাওয়া ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। রোববার অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপনগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। শাস্তি মওকুফ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন উপকমিশনার মো. শাহাদাত জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল বাশার, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া, উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল আলম, কমিশনার জাকির হোসেন, যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির, অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু, অতিরিক্ত কমিশনার আ আ ম আমীমুল ইহসান, অতিরিক্ত কমিশনার সিফাত-ই-মরিয়ম এবং অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহাম্মদ তারেক রিকবদার। এ ছাড়া রয়েছেন উপকর কমিশনার নো. জিল্লুর রহমান, উপকর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল, অতিরিক্ত কর কমিশনার মির্জা আশিক রানা, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, যুগ্ম কর কমিশনার মামুন মিয়া, অতিরিক্ত কর কমিশনার মিজ চাঁদ সুলতানা, অতিরিক্ত কর কমিশনার সুলতানা হাবীব, অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ, যুগ্ম কর কমিশনার মিজ মাসুমা খাতুন ও যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন।
যে অভিযোগে দণ্ড:
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জুন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এসব কর্মকর্তা রাজস্ব ভবনের প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে ওই বছরের ২২ জুন জারি করা বদলির আদেশ আইনসংগত কারণ ছাড়া প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলেন। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে এ ঘটনা ঘটিয়ে তারা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং বদলি আদেশ অমান্যকারীকে সমর্থন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের আচরণ চাকরির শৃঙ্খলার জন্য হানিকর, শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং সরকারি আদেশ অবজ্ঞার শামিল উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এটি ‘সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ৩০৩ বিধির লঙ্ঘন এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের পর্যায়ভুক্ত। বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারও বেতন কয়েক ধাপ এবং কারও বেতন কয়েক বছরের জন্য অবনমিত করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল:
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দণ্ডাদেশ মার্জনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করেন। রাষ্ট্রপতি তাদের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তাদের মূল বেতনে অবনমিতকরণসূচক লঘুদণ্ড বাতিল করে তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যে আন্দোলন ঘিরে শাস্তি:
২০২৫ সালে এনবিআরকে দুই ভাগ করে ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ ও ‘রাজস্ব নীতি’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করার বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর বিরোধিতায় কলমবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগের দাবিতেও আন্দোলনে নামেন এবং তাকে কার্যালয়ে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন। দাবি আদায়ে ২৮ জুন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু হলে আমদানি-রপ্তানিসহ এনবিআরের বিভিন্ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরদিনও কর্মসূচি চললে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআরের সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে। এরপর নতুন সরকার গঠনের আগেই আন্দোলনে জড়িত একের পর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয় এবং কারও বিরুদ্ধে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে গত ১৮ আগস্ট রাজস্ব সম্মেলনে এনবিআর কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তি প্রত্যাহারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন।









