সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার

সময়: 10:27 am - September 21, 2026 |

নেছার আহমদ:

সাইবার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সাইবার অপরাধ দমন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ বিনিময়সহ নিরাপত্তা খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের এক বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার পাশাপাশি সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ বিনিময়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

চীনা রাষ্ট্রদূতের বিদায় ও সফরের আমন্ত্রণ:

বৈঠকের শুরুতে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আগামী অক্টোবরের শুরুতে বাংলাদেশে তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ শেষ করে দেশত্যাগের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এ সময় তিনি চীনের জননিরাপত্তামন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে চীনের জননিরাপত্তা বিষয়ক ফোরামে বাংলাদেশ ও চীনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের পারস্পরিক বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বাড়াতে চীন সফরের জন্য দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণ বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে পৌঁছে দেন ইয়াও ওয়েন। বৈঠকে উভয় পক্ষই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবর্তিত অপরাধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ:

বৈঠকে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকার পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি বিশেষায়িত ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। জেলা পর্যায়েও বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।  এর ফলে সাইবার অপরাধ তদন্ত, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

শতাধিক সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে চীন:

বৈঠকে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত জানান, গত দুই বছরে চীন বাংলাদেশের শতাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এসব প্রশিক্ষণের মধ্যে সাইবার ক্রাইম, পাবলিক সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট, ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন ম্যানেজমেন্ট, ইমিগ্রেশন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসংক্রান্ত বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

চীনে যাবে পুলিশের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল:

সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিআইডির নেতৃত্বে পুলিশের পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীনে পাঠানোর ঘোষণা দেন। প্রস্তাবিত প্রতিনিধি দলে একজন অতিরিক্ত আইজিপি, একজন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং সাইবার ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তারা থাকবেন। প্রতিনিধি দলটি চীনের সাইবার ল্যাব ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পরিদর্শন করবে। পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশে ফরেনসিক ল্যাব ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপনের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রস্তুত করা হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

চীনা নাগরিক ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসে:

বৈঠকে বাংলাদেশে কর্মরত চীনা নাগরিক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী ও শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশ। বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চীনা নাগরিকদের অংশগ্রহণ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চীন শুধু বাংলাদেশের শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর একটি নয়, বরং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কৌশলগত উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। সে সময়ও আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

নিরাপত্তা সহযোগিতায় নতুন মাত্রা:

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহযোগিতা নতুন নয়। তবে সাইবার অপরাধের বিস্তার এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ধরন পরিবর্তনের কারণে এ খাতে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পুলিশের সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত ইউনিট ও ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ডিজিটাল অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল ফরেনসিক, ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।  চীনের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, অতিরিক্ত আইজিপি ও সিআইডি প্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর