খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

সময়: 8:41 am - October 10, 2026 |

মানব কথা ডেস্ক:

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ আদায় জোরদার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায়ে গতি আনা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনার আওতায় খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম তদারকি, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের উৎসাহিত করা এবং ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের উদ্যোগ রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর আলোচনা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব আলোচনায় ঋণ আদায়ের পথে বিদ্যমান বাধাগুলো চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি বাধা দূর করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে। এ ছাড়া ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ ২০ খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে। যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেশি, সেগুলোর জন্য ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশলবিষয়ক বিশেষ নির্দেশিকা প্রণয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হবে, যাতে ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে আদায় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি বাড়ানো যায়।

ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুসরণ করে প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি বা ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ পদ্ধতিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও সংস্থান সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি আগেভাগে নিরূপণ এবং ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের আইনগত দিকগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, ব্যাংক খাতে ছাড় দেওয়ার বিদ্যমান প্রবণতা ধীরে ধীরে বন্ধ করতে এ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আরও উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা—উভয় পক্ষকে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করার মতো প্রণোদনা তৈরি করতে হবে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী দুই থেকে তিন বছরে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে ঋণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় করা এবং আদায় কার্যক্রমে গতি আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের চিহ্নিত করে তাঁদের প্রণোদনা দেওয়ার বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধে গ্রাহকদের উৎসাহ বাড়বে এবং দায়িত্বশীল ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় ঋণ অনুমোদন, তদারকি, আদায় ও শ্রেণিকরণের প্রতিটি পর্যায়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ সৃষ্টির পেছনে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ঋণ খেলাপি হওয়ার পর শুধু আদায় তৎপরতা বাড়ানোর পরিবর্তে ঋণ বিতরণের শুরু থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে সংস্কারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। খেলাপি ঋণের এ চাপ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ঋণ আদায় কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করতে ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। গত ২২ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সভার সিদ্ধান্ত এবং ২৬ এপ্রিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার পর খসড়াটি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত খসড়াটি গত ২৪ আগস্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০ সেপ্টেম্বর। এ ছাড়া ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে ‘অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে। আইনটি যুগোপযোগী করতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন ও বিচার বিভাগে পাঠায়। বর্তমানে সংশোধিত আইনের খসড়া তৈরিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি কাজ করছে।

খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে ‘দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের কাজও চলছে। একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালের বিদ্যমান দেউলিয়াত্ব আইন আধুনিকায়ন করে ‘দেউলিয়াত্ব ও দেউলিয়া কার্যক্রম আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেউলিয়াত্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক করা, সামগ্রিক দেউলিয়া কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থার (আইএফসি) সহায়তায় নতুন দেউলিয়াত্ব আইনের ইংরেজি খসড়া আধুনিক কাঠামোতে চূড়ান্ত করা হয়েছে। খসড়াটি বাংলায় অনুবাদের জন্য আইএফসির সহায়তা চেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বাংলা সংস্করণ চূড়ান্ত হলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ আদায়ে তদারকি জোরদার, ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধে গ্রাহকদের উৎসাহিত করার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন ও ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর