সেঞ্চুরি মানিকের আত্মীয় সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব, দূর্নীতিতে যেমন চ্যাম্পিয়ন লাম্পট্যেও রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবেন
সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব ফ্যাসিবাদ সরকারের অন্যতম দোসর শেখ হাসিনার ৪র্থ মন্ত্রী সভার সাবেক পানি সম্পদ মন্ত্রী শরিয়তপুর-২ আসনের এমপি এনামুল হক শামীমের নিকট আত্মীয়।সেই সূত্রে তিনি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ব বিদ্যালয়ের সেঞ্চুরি মানিকেরও আত্মীয়। আন্দালিব নিজেও বুয়েট ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। তিনি ফ্যাসিবাদের পুরো সময় জুড়ে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্ব পূর্ণ স্থানে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ছিলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সাবেক সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নিজ জেলা নোয়াখালী গণপুর্ত বিভাগে পোস্টিং নেন। তিনি যেখানেই গিয়েছেন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দূর্নীতির মাধ্যমে দুহাতে টাকা কামিয়েছেন। আর ঢেলেছেন নারী ও মদের পিছনে। তার আত্মীয় মানিকের মতো সেঞ্ছুরি করতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে ধরা খেয়ে পারিবারিক কলহ মামলা পর্যন্ত গড়ায়। দূর্নীতির টাকায় নানা জায়গায় হারেম খুলে তিনি ফূর্তি করে বেড়ান, যেন মধ্য যুগের কোন ভোগী জমিদার। এত নারীর দায়িত্ব যখন নিয়েছেন তখন স্যার একটু আধটু দূর্নীতি তো করবেনই। তার দূর্নীতির কিছু ফিরিস্তি আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলোঃ
নোয়াখালী পর্বঃ
সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবের দুর্নীতির নোয়াখালী গণপুর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় ভয়াবহ চিত্র দৈনিক মানব কথার অনুসন্ধানে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষন কাজের জন্য জেলার ৪৮টি স্থাপনার ৬৮টি কাজের জন্য পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যার মেয়াদ ২০২৩ সালের জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ছিল। এর আগেই সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক কাজের কিছুই করা হয়নি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। আর করলেও নামমাত্র কাজ করে ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশ করে সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব ভাগভাটোরায়া করে নেন। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষন কাজে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্তূপ করে রাখা ময়লা অপসারণের খাতে ১৪ লাখ ১২ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় বাস্তবে এর কিছুই চোখে পড়েনি। ওই স্থানে তখনো ময়লার স্তূপ পড়ে ছিল। এমন প্রকল্পের খবর জেলা প্রশাসক নিজেও জানতেন না। নোয়াখালী গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনটি ২০১৯ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সরকার। তা সত্ত্বেও আরএপিপি প্রকল্পে ওই বাসভবনে ৩২ লাখ ৪৪ হাজার টাকার মেরামত ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর বাসভবনে ১৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা মেরামত কাজ দেখানো হয়েছিল। নোয়াখালী সার্কিট হাউজে ফুল বাগানের মাটি ভরাট, সেলুটিং ডায়াস, প্যারেড গ্রাউন্ড, ওয়াকওয়ে, রাস্তার পাশে ফুলের বেড উঁচুকরণ ও টাইলস স্থাপনে নামমাত্র কাজ করে ১৪ লাখ ২২ হাজার টাকা, গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এর অফিস কক্ষের ফ্লোর ও ওয়ালে টাইলসকরণ, দরজা-জানালার গ্রিল পরিবর্তনসহ থাইগ্লাস লাগানো ও রংকরণসহ স্যানিটারি কাজে ১৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের অধীন বিভিন্ন ভবন পরিষ্কার ও ধৌতকরণ কাজে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা, নোয়াখালী চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে সিসিটিভি স্থাপনে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার, একই স্থানে বিচারপ্রার্থীদের জন্য মাতৃদুগ্ধপান স্থাপন, অজুখানা নির্মাণ ও বিচারপতির আগমনে ভবন রংকরণে ২৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল ২০২২-২৩ অর্থ বছরে। এ ধরনের বিভিন্ন কাজ দেখিয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক কোটি ৪০ লাখ আট হাজার টাকা, গণপূর্ত বিভাগীয় কার্যালয়ে ৯১ লাখ ৬৮ হাজার, আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজে ৫২ লাখ ২৮ হাজার, জেনারেল হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে ১৬ লাখ ৭১ হাজার, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ৭৪ লাখ ৬৪ হাজার, জেলা কারাগার ও পাসপোর্ট কার্যালয়ে ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার, সদর পৌর বাজার ও সুবর্ণচর ফায়ার সার্ভিসে ২৪ লাখ ২০ হাজার এবং জেলা চিফ জুড়িসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ে এক কোটি ২২ লাখ ৮৮ হাজার টাকার কাজের বিল তোলা হয়েছিল। একইভাবে জেলার স্বাস্থ্যখাতের মেরামতের (কোড-১৩৮) এক কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকার কাজেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ১৮ জুন ২০২৩ প্রকল্পের ৯টি কাজের মেয়াদ শেষ হলেও যে কাজগুলো করা হয়েছে তাও নামমাত্র লোক দেখানো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক কোটি ২৮ লাখ টাকার কাজের মধ্যে রয়েছে নোয়াখালী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্যানিটারি ও বিদ্যুতের কাজের সঙ্গে সম্মেলন কক্ষ মেরামতে ২০ লাখ, সীমানা প্রাচীর (বাকি কাজ) নির্মাণ ২০ লাখ, পার্কিংয়ে ফুটপাত টাইলস ও ভবন মেরামতে ১২ লাখ, ২৫০ শয্যার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারের সীমানা প্রাচীর উঁচু করা ও কাঁটাতার স্থাপনে ২০ লাখ, এসি ও পাম্পের মোটর মেরামতে ১০ লাখ, ডিবি বোর্ডের সার্ভিসিং ও আইসোলেশন ভবনের সার্ভিস পরিবর্তনে ছয় লাখ ৮০ হাজার, আবাসিক কোয়ার্টারের টয়লেট, সেপটিক ট্যাঙ্ক ও স্যানিটারি মেরামতে ২০ লাখ, মর্গের পাশে মরদেহ সংরক্ষণ কক্ষ নির্মাণে ১০ লাখ এবং মাইজদী স্কুল হেলথ ক্লিনিকের টিনশেড গ্যারেজ সংস্কারে ১০ লাখ টাকা।
ঘুষের টাকা নিয়ে ঠিকাদার প্রকৌশলীর বাহাস গড়ায় মামলা অব্দিঃ
২০২৩ সালে ঘুসের টাকা না পেয়ে হেনস্তার অভিযোগে নোয়াখালীর গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওমর সাহেদ রিশাদ নামে এক ঠিকাদার। দৈনিক মানব কথার অনুসন্ধানে জানা যায় মঙ্গলবার (১১ জুলাই) ২০২৩ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উপস্থাপন করা হলে এসএম মোসলেহ উদ্দিন মিজান মামলাটি গ্রহণ করে বুধবার (১২ জুলাই) জুডিসিয়াল সাক্ষীর জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছেন। মামলার অপর দুই আসামি হলেন- নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের স্টাফ অফিসার কর্মকর্তা জাহিদ হাসান অপু ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী আরিফ শিকদার। মামলা সূত্রে জানা গেছে, মেসার্স ওমর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ওমর সাহেদ রিশাদ নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবের নির্দেশে সুবর্ণচর ফায়ার সার্ভিস ভবনের মেরামতের কাজ করেন। গত ১৬ এপ্রিল ১৭ লাখ ৫ হাজার ৪৫৬ টাকার বিল চাইতে গেলে আসামিরা ২০ শতাংশ ঘুস দাবি করেন। বাদী ঘুস দিতে অপারগতা জানালে নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে বাদিকে মারধরসহ লাঞ্ছিত করেন আসামিরা।
ডিও লেটার কেলেঙ্কারিঃ ২০২৪ সালে সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব কে অব্যহত দূর্নীতির দ্বায়ে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ হতে ফেনী গণপূর্ত বিভাগে বদলী করা হয়। তখন নিজের বদলি ঠেকাতে তৎকালীন সেতু মন্ত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত প্যাডে ডিও লেটার জালিয়াতি করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব। ঘটনাটি ওই সময়ে জানাজানি হওয়ার পর এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয় অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামিম আখতারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে।যদিও জাল ডিও লেটারের বিষয়ে গণমাধ্যমে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছিলেন আন্দালিব। তার অস্বীকার করার পরে এই জাল ডিও লেটার কীভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এলো কিংবা কারা এই জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত সেই বিষয়ে অদ্যবধি একটি তদন্ত কমিটি করার চিন্তাও করেননি সংশ্লিষ্টরা।
ব্রাহ্মণ বাড়িয়ায় বদলী ও মডেল মসজিদে দূর্নীতিঃ নিজের ঠিকাদারী সিন্ডিকেট বজায় রাখতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে ফেনীতেও ধারাবাহিক ভাবে দূর্নীতির অভিযোগ আসতে থাকে। ফলে তাকে ব্রাহ্মণ বাড়িয়া জেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু সরাইল মডেল মসজিদ নির্মান কাজে নিম্নমানের কাজ হওয়ার অভিযোগে সর্ব মহল থেকে চাপ সৃষ্টি হলে তাকে নীলফামারী জেলায় বদলী করা হয়। তারপর কোন এক জাদুমন্ত্র বলে এই দূর্নীতির বরপুত্র গত ২০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিঃ প্রজ্ঞাপন নং ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১৯.১০৩.২৪- ১৫৪৯ মাধ্যমে শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ পোস্টিং পান।
এক কাজে ৮৭ টি টেন্ডারের ওটিএম নৈরাজ্যঃ শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ এসেও তিনি থেমে নেই। স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠানকে পুজি করে এই সুযোগ সন্ধানী কর্মকর্তা ২৬ মার্চ উদযাপনের নামে প্যারেড গাউন্ড ৮৭ টি ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করেছেন। পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কে কাজ পাইয়ে দিতে ঈদ উল ফিতরের ছুটির ভিতর এক দিন ব্যাংক খোলা রেখে এরূপ আয়োজন করেছেন। প্রতিটি দরপত্রে তিনটি থেকে চারটি করে প্রতিষ্ঠান অংশ গ্রহণ করছে যা তার নিজেরই সিন্ডিকেটের ঠিকাদার।এ বিষয়ে তার বক্তব্য প্রদানের জন্য ফোন করা হলে তিনি সামনা সামনি কথা বলতে চান।
এমন দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ফ্যাসিবাদের দোসর পেলেন প্রাইজ পোস্টিং। তিনি এখানে এসেও পিপি আর এঁর তোয়াক্কা না করে খেয়াল খুশি মতো ওটিএম করছেন, জবাব দিহিতা ছাড়াই যাকে ইচ্ছে তাকে বাদ দিচ্ছেন টু পাইস কামানোর আশায়। তিনি ডিপিপি পাস হওয়ার আগেই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার একটি কাজের ভাগবাটোয়ারা করার জন্য ঠিকাদারদের কাছে কমিটমেন্ট করে বসে আছেন। তার দূর্নীতির ছুটে চলা পাগলা ঘোড়ায় লাগাম টানবে কে?
















