পানির সংকটে খরাপ্রবণ অঞ্চলে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

সময়: 1:35 pm - July 2, 2026 |

মিজানুর রহমান:দেশের খরাপ্রবণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে নিরাপদ পানির সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পানির অভাবে শুধু কৃষি ও জীবিকাই নয়, দৈনন্দিন মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। হাত ধোয়া, গোসল, রান্না, কাপড় পরিষ্কার এবং নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থার মতো প্রয়োজনীয় কাজেও অনেক মানুষকে পানি ব্যবহারে কঠোর সাশ্রয় করতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর নাজমা রহমান বলেন, “নিরাপদ পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, চোখের সংক্রমণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়তে পারে।” তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। নওগাঁর বাসিন্দা রোকসানা বেগম বলেন, “এক বালতি পানি আনতেই অনেক দূর যেতে হয়। তাই প্রয়োজন না হলে পানি ব্যবহার করতে ভয় লাগে।” চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, “সেচের জন্য যেমন পানি কম, তেমনি পরিবারের প্রয়োজনীয় কাজেও পানি জোগাড় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নারী, শিশু এবং বয়স্ক মানুষের ওপর। অনেক এলাকায় নারীদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা তাদের সময়, শ্রম এবং স্বাস্থ্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। সমাজবিজ্ঞানী ডক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “পানি সংগ্রহের দায়িত্ব অনেক পরিবারে নারীদের ওপর থাকে। এতে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ে।”
চিকিৎসকদের মতে, পর্যাপ্ত পানি না থাকলে হাত ধোয়ার অভ্যাস কমে যায়, যা সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। শিশু বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি থাকলে তাদের মধ্যে পানিবাহিত রোগ এবং অপুষ্টির সমস্যা বাড়তে পারে।”খরাপ্রবণ এলাকার সাধারণ মানুষও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। রাজশাহীর গৃহিণী সেলিনা খাতুন বলেন, “পানি এত হিসাব করে ব্যবহার করতে হয় যে অনেক সময় গোসল বা কাপড় ধোয়ার কাজ পিছিয়ে দিতে হয়।” নওগাঁর কলেজশিক্ষার্থী ইমরান হোসেন বলেন, “পানির সংকট শুধু গ্রামের সমস্যা নয়, ভবিষ্যতে এটি সবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।”জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ ডক্টর মাহবুব আলম জানান, অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, জলাধার ভরাট এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অভাব সংকটকে আরও তীব্র করছে। তিনি বলেন, “বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।”

পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্থানীয় পর্যায়ে পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং নিরাপদ পানির উৎস বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে নিয়মিত প্রচারও জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, খরাপ্রবণ অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট এখন শুধু পরিবেশগত বা কৃষি সমস্যা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু। পর্যাপ্ত পানি ছাড়া মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যার প্রভাব ব্যক্তি থেকে শুরু করে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনাকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করাই হতে পারে ভবিষ্যতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর