জলবায়ুর অভিঘাতে হুমকির মুখে বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব
রুহুল আমীন মোল্লা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু মানুষের জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; পৃথিবীর অসংখ্য বন্যপ্রাণীও অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবাসস্থল ধ্বংস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, দাবানল এবং অনিয়মিত ঋতুচক্রের কারণে বহু প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, কোনো প্রাণী শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে-এমন দাবি সব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ, অতিরিক্ত শিকার এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট চাপ একসঙ্গে কাজ করছে।বন্যপ্রাণী গবেষক ডক্টর আরিফুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন জীববৈচিত্র্যের ওপর একটি বড় চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক প্রাণী তাদের উপযোগী পরিবেশ হারাচ্ছে। যারা দ্রুত নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না, তারা ক্রমেই বিলুপ্তির ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।” তাঁর মতে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জলবায়ু অভিযোজন এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সমুদ্রনির্ভর প্রাণীরাও এই পরিবর্তনের বড় শিকার। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ডক্টর নুসরাত জাহান জানান, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অম্লতা বাড়ার ফলে প্রবাল প্রাচীরের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হলে অসংখ্য মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের স্থান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”স্থলভাগের বনাঞ্চলেও একই ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে। পরিবেশবিদ ডক্টর শামীম আহমেদ বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী খরা, দাবানল এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বনাঞ্চলের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। এতে অনেক স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ এবং উভচর প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাস হারাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, কিছু প্রাণী নতুন এলাকায় চলে যেতে পারলেও অনেক প্রজাতির সেই সক্ষমতা নেই।বাংলাদেশেও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা গবেষক ডক্টর মাহমুদ হাসান বলেন, “উপকূলীয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীর প্রবাহে পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব বনজ উদ্ভিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর ওপরও পড়ছে।” তাঁর মতে, বাস্তুতন্ত্র সুস্থ না থাকলে প্রাণীকুলের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। খুলনার শিক্ষক মো. জাকির হোসেন বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামে অনেক ধরনের পাখি দেখা যেত। এখন সেগুলোর অনেকই চোখে পড়ে না।” কক্সবাজারের জেলে নুর আলম জানান, “আগে সহজে যেসব মাছ ধরা যেত, এখন অনেক প্রজাতি আগের মতো পাওয়া যায় না।”তরুণদের মধ্যেও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহজাবিন রহমান বলেন, “প্রতিটি প্রাণী প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর তার প্রভাব পড়ে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন উজাড় বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ, নদী ও সমুদ্রের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ শিকার প্রতিরোধ এবং জলবায়ু সহনশীল সংরক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পর্যায়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও জোর দিচ্ছেন তাঁরা।পরিবেশ নীতিবিদ ডক্টর ফারজানা করিম বলেন, “প্রাণীদের রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রজাতিকে বাঁচানো নয়; এটি প্রকৃতির ভারসাম্য, খাদ্যশৃঙ্খল এবং মানবজীবনের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখারও প্রশ্ন।”
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ুর অভিঘাতে বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব সংকট বিশ্ববাসীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সময়মতো কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা না গেলে বহু মূল্যবান প্রজাতি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।








