জলবায়ুর পরিবর্তিত বাস্তবতায় ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সময়: 1:21 pm - July 2, 2026 |

নিজাম উদ্দিন:বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, আর এর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকেরা বলছেন, উষ্ণ সমুদ্র শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের জন্য বেশি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং কিছু অঞ্চলে অত্যন্ত তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও ঘূর্ণিঝড়ের মোট সংখ্যা সব অঞ্চলে একইভাবে বাড়ছে-এমন সিদ্ধান্তে বিজ্ঞানীরা একমত নন, তবে উচ্চ তীব্রতার ঝড়ের ঝুঁকি ও অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আবহাওয়াবিদ ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা নয়, বরং এর তীব্রতা, দ্রুত শক্তি অর্জন এবং ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতাই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়।” তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় দেশগুলোকে দুর্যোগ প্রস্তুতিতে আরও আধুনিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশসহ বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন অঞ্চলের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এলাকার মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত বসবাস করছেন। বরগুনার বাসিন্দা মো. সেলিম হাওলাদার বলেন, “প্রতিবার ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। আগের চেয়ে ঝড়ের সময় বাতাস আর বৃষ্টির তীব্রতা বেশি মনে হয়।” সাতক্ষীরার গৃহিণী রেহানা বেগম বলেন, “ঝড়ের পর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় ঘরবাড়ি আর পানির সমস্যা নিয়ে। পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনেক সময় লাগে।” দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ডক্টর শারমিন আক্তার বলেন, “বর্তমানে শুধু বাতাসের গতিবেগ নয়, ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতাও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।” তিনি বলেন, আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণের প্রশিক্ষণ দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।পরিবেশ গবেষক ডক্টর ফারহান কবীর জানান, উপকূলীয় বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, “ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী সম্প্রসারণ এবং নদী-খাল পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগ দুর্যোগের অভিঘাত কমাতে সহায়ক হতে পারে।”

জেলেদের জীবনেও পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। কক্সবাজারের জেলে নুরুল ইসলাম বলেন, “আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায়। কখন সমুদ্র উত্তাল হবে, তা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই মাছ ধরতে গেলেও এখন অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়।” সাধারণ মানুষের মধ্যেও দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে। পটুয়াখালীর কলেজশিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, “আগাম সতর্কবার্তা এখন অনেক মানুষ গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করেন। তবে নিরাপদ আশ্রয় ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার।” খুলনার শিক্ষার্থী সাবরিনা ইয়াসমিনের মতে, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু সরকার নয়, সাধারণ মানুষকেও পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে হবে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রযুক্তি, উপকূলীয় বাঁধের উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তিত বাস্তবতায় ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর