গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফজলুল হক (মধু) দায়মুক্তি পেয়ে বহাল তবিয়তে

সময়: 2:25 pm - January 6, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক: মির্জা আজমের শীষ্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফজলুল হক (মধু) দায় মুক্তি পেয়ে এখনও টেন্ডার বানিজ্য করে বহাল তবিয়তে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার আগেই আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীমকে অবৈধভাবে অগ্রিম ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করার ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী, শেরে বাংলা নগর-১ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে যশোরে চলতি দায়িত্বে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত) মোহাম্মদ ফজলুল হককে বেতন গ্রেড কমানোর শাস্তি দিয়ে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন অভিযুক্ত প্রকৌশলীকে বর্তমান বেতন গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে নামিয়ে দেওয়ার বিষয়ে গত ২৫ জানুয়ারি এক অফিস আদেশ জারি করেন।অতি সম্প্রতি তার এই শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। যশোর গণপূর্ত সার্কেলের অধীন প্রায় সকল ডিভিশনের ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এপিপির কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান অনুমতি প্রদান করে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন এবং টেন্ডার বানিজ্যের মহাউৎসব করছেন ফজলুল হক মধু।যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের দরপত্র অনিয়ম করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়া,যশোর,নড়াইল, মাগুরা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান অনুমতি দিয়েছেন।এতও কিছুর পরও এখনও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর ফজলুল হক মধু বহাল তবিয়তে গণপূর্ত অধিদপ্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সাবেক এই বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা তাই মধুর ডালি নিয়ে ঘুরছেন আরো ভালো পোস্টিং এর আশায়। বিগত ১৫ বছরে লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নিয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ফ্যাসিস্ট এর সুবিধা ভোগী কর্মকর্তাদের একত্র করে তিনি পরবর্তী প্রধান প্রকৌশলী কে হবেন সে লক্ষে কাজ শুরু করেছেন। এরা স্যাবোটেজ করে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে বেকায়দায় ফেলার মিশন নিয়ে নিয়মিত উত্তরায় এলাকায় গোপন বৈঠক করছেন। তাছাড়া তার নেতৃত্ব ফ্যাসিস্টের অপরাধের অংশীদার জাতীয় পার্টি (জাপা)র নেতৃত্ব গড়ে উঠা রাজনৈতিক জোট ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ এ অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে। ভারতীয় দূতাবাসের প্রশিক্ষিত এই সাবেক ছাত্রলীগ নেতার দূর্নীতির মহীরুহ হয়ে উঠার কাহিনী আর তার দায় মুক্তির পেছনের তথ্য আজ আমরা অনুসন্ধান করবো।

জামালপুরের সরিষা বাড়ির এক অতি সাধারন পরিবারে তার জন্ম ও বেড়ে উঠা। ২১ তম বিসিএস এর এই কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি আরেক আওয়ামী লীগ নেতা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হাফিজুর রহমান টিপু মুন্সীর ভায়রা হওয়াতে শুরু থেকেই ভালো পোস্টিং পেতে থাকেন। মহাখালীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী থাক কালে তিনি পদোন্নতি পান। প্রথমেই রাজশাহীর মতো বিভাগীয় শহরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে তার পদায়ন সে সময় আলোচনার জন্ম দেয়। এক বছর না যেতেই ততকালীন প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়াকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে মিরপুর ডিভিশনে বদলী হয়ে আসেন। ঢাকায় এসেই তিনি শওকতুল্লাহ গংদের সাথে মিলে মন্ত্রী মোশারফ এর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। তিনি ঢাকা জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, মোসলেহ উদ্দিন, শওকতুল্লাহর সাথে মিলে ঠিকাদারীর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রনে জড়িয়ে পড়েন। মিরপুরে তিনি নিজে বেনামে ঠিকাদারী করতেন। তিনি যশোরের জাকির হোসেন, জাফর, মিরপুর স্বেচ্ছা সেবক লীগ এর আহবায়ক আবুল কালাম, হ্যাপী, শেখ শামসু এদের মাধ্যমে নিজে ঠিকাদারি করতেন। এদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগনেতা কালামকে তিনি নিজের আত্মীয় পরিচয় দিতেন। মিরপুরে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিদের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মান প্রকল্প সমূহের সকল টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রনে মাফিয়া ঠিকাদার সাবেক যুবলীগ নেতা এসএম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জিকে শামীমের সাথে সম্পন্ন করেন। প্রকাশ্যে শামীম সিন্ডিকেট নিয়ন্তন করলেও সেই টাকার ভাগ পেতো আন্ডার অয়ার্ল্ড ডন বিকাশ। বিকাশ এর মাধ্যমে সেই টাকা দুবাই, মালয়েশিয়া হয়ে চলে যেত শেখ রেহানার কাছে। বিকাশ প্রকাশের হয়ে জিকে শামীমের পক্ষে কাজ করতো বগা লিটন ও জনি। এই বগা লিটন ও জনি ছিল ফজলুর ডান হাত। বিকাশ এর সাথেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো। বিকাশ ও জিকে শামীম তার উপর সন্তুষ্ট থাকায় তাকে আরো গুরুত্বপূর্ন শেরে বাংলা নগর ১ এ পোস্টিং করিয়ে দেন। ফলে জিকে শামীম এর উপর তার এমনিতেই দায় বদ্ধতা ছিল। ফলে আকছার তিনি কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে জিকে শামীম কে অতিরিক্ত বিল দিয়ে দিতেন। বিধি বাম হলো ক্যাসিনো কান্ডে জিকে শামীম গ্রেফতার হলে। আসলে বিল দিয়েছিলেন ১০ কোটি টাকার দ্বিগুনেরও বেশি। মিডিয়ায় ধরা পরার কয়েক মাস পরে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়েছেন, এর মধ্যে নিজেরা কাজ করে ধামা চাপা দেবার চেষ্টা হয়েছে। তার পর পাওয়া যায় সাড়ে দশ কোট টাকা অগ্রিম বিল দেয়ার প্রমান।

এক নজরে দেখে আসা যাক সেই অগ্রিম বিল দেয়ার ঘটনাঃ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে ১০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদান করা হয়েছে জেলহাজতে থাকা এসএম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে। ম্যাজিস্ট্রেটের সরেজমিন পরদর্শনের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত বিল প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে বর্তমানে কর্মরত গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী চিঠিও লিখেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। কিন্তু তারপরও গণপূর্তের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবৈধভাবে অতিরিক্ত বিল প্রদানের জন্য দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেননি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা তদন্ত কমিটিও গঠন করেননি। এমনকি শোকজ পর্যন্ত করেননি। বরং অযৌক্তিক কমিটি গঠন ও চিঠি চালাচালির মাধ্যমে সময় ক্ষেপণ এবং গুরুতর অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিষয়ে তদন্তও করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করেছে। আলোচিত এই প্রকৌশলীর নাম মো. ফজলুল হকের (মধু)। তৎকালীন সময়ে গণপূর্তের শেরেবাংলা নগর-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকলেও পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) হন। শেরে বাংলা নগর পূর্ত বিভাগ-১ এর তার উত্তরসুরী নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন গত ২১ মার্চ, ২০২১ ঢাকা গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোন এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তার চিঠিতে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক কাজের মূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত বিল প্রদানের প্রমাণের কথাও বলা হয়েছে। তারপর থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে শুধু অযৌক্তিক চিঠি চালাচালিই করেছেন। এমনকি এ বিষয়ে একাধিক অযৌক্তিক কমিটিও গঠন করে, যেসব কমিটিকে নতুন করে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। বস্তুত, সময়ক্ষেপণ এবং দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার অপকৌশল ছাড়া কিছুই ছিলো না। গণপূর্তের মাফিয়া ঠিকাদার জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজটি তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা কাজটি বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। ওই সময় এ প্রকল্পে ঠিক কতোটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে তা নিশ্চিত হতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, কাজের মূল্যের চাইতে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করা হয় শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্সকে। মূলত, ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কাজ শুরু করে জি কে শামীমের মালিকানাধীন জি কে বিল্ডার্স। এ প্রকল্পে ১৬৭ কোটি ৭৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩৩ টাকা ব্যয়ে ১৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য সময় ছিল ২৪ মাস। কিন্তু কাজের কিছু অংশ শেষ হওয়ার পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। তখন গণপূর্তের পক্ষ থেকে সরেজমিনে পরিদর্শন করে কর্তৃপক্ষ জেনেছে ‘ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শোর পাইলিংয়ের কাজ শেষ করে হাসপাতালের মূল ভবনের মাটি কাটার কাজ আংশিক শেষ করেছে। বেজমেন্টের ম্যাটের প্রায় ৩০ ভাগ ঢালাই শেষ করে সেখানে ২ ও ৩ নম্বর বেজমেন্টের ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে।’ জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণকাজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় ২০২০ সালের বছর ১৩ জানুয়ারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এরপর বিধিমতে নির্মাণকাজের যৌথ পরিমাপের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হোসাইনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই বছরের ২২ মার্চ প্রকল্প পরিচালক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ঠিকাদারের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে কাজের যৌথ পরিমাপ করা হয়। সেই যৌথ পরিমাপে সম্পাদিত কাজের মূল্যমান দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ৯৪৫ টাকা। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। আবার তিন মাসের মাথায় আরও ৩০ জুন আরও ২০ কোটিসহ মোট ২৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারকে। সেই হিসাবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেশি দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত অধিদফতরের শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন ২০২১ সালের ২৮ মার্চ এসব বিষয়গুলো জানাতে ঢাকা গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোন এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে একটি পত্র পাঠান। সংযুক্তি হিসেবে তিনি যৌথ পরিমাপের কপি ৩৯ পাতা এবং বিল এর কপি ও অন্যান্য আরো ১৫ পাতা উক্ত চিঠির সঙ্গে প্রেরণ করেন। একই বিষয় অবিহিতকরণ ও পরবর্তী নির্দেশনা প্রাপ্তির জন্য গণপূর্তের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩ (শেরেবাংলা নগর) এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রোকন উদ্দিন গত ৪ এপ্রিল, ২০২১ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দেন। তিনি দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বা অপরাধের দায়-দায়িত্ব নিরূপণের বিষয়ে চিঠিতে কিছুই লেখেননি। আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করার বিষয়ে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীকে অবহিত করতে গত ১২ এপ্রিল, ২০২১ একটি চিঠি পাঠান গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোন এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু। ওই চিঠিতে প্রকল্পের নতুন দরপত্রের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও অবৈধ ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত বিল প্রদানের জন্য দায়-দায়িত্ব নিরূপন এবং দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। সরকারের বিধি-বিধান বা আইন-কানুন মতে, যদিও এই পর্যায়ে দায়ী কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড এবং তার বিরুদ্ধে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করাটা অপরিহার্য ছিলো সেটি না করে প্রধান প্রকৌশলী একটি অযৌক্তিক এবং প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নেন। গত ৩ মে, ২০২১ গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মাদ শামীম আখতার জি কে বিল্ডার্সকে অতিরিক্ত বিল প্রদানের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা পাওয়ার জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করেন। ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়- গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (স্বাস্থ্য উইং) মো. খাইরুল ইসলামকে, নির্বাহী প্রকৌশলী (সংস্থাপন) আহমেদ আবদুল্লাহ নুরকে সদস্য সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৪) মোহা. উজির আলীকে সদস্য করা হয়। কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে বলা হয়, “১) বর্ণিত প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্যাদিসহ আর্থিক সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করবেন। ২) প্রকল্পের আর্থিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনে হিসাব রক্ষণ দফতরের মতামত গ্রহণ করবেন। ৩) ক্রমিক ১ ও ২ বিশ্লেষণপূর্বক সার্বিক সুপারিশ পেশ করবেন।” এই কমিটিকে অনিয়ম তদন্তের কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়নি। কমিটির কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে কিছু অযৌক্তিক কথা দিয়ে। কারণ, কমিটিকে যেসব তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে ওই তথ্যগুলো ইতিপূর্বে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনই গত ২৮ মার্চ প্রেরণ করেছেন। তাছাড়া এতোবড়ো অনিয়ম-দুর্নীতির হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন না করে শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য কমিটি গঠনের বিধি-বিধান বা নজির অতীতে নেই। প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের স্বাক্ষরে কমিটি গঠনের এই চিঠিটি ইস্যু করা হয় গণপূর্ত অধিদফতরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে। অন্যদিকে একই তারিখে প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের স্বাক্ষরে গণপূর্ত অধিদফতরের সংস্থাপন শাখা-৩ থেকে কমিটি গঠনের বিষয়ে আরেকটি চিঠি ইস্যু করা হয়। এই কমিটিতেও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলামের নেতৃত্বে একই সদস্যদের রাখা হয়। তবে এই কমিটি গঠনের ‘অফিস আদেশ’-এ কার্যপরিধির বিষয়ে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। এর কার্যপরিধি সম্পর্কে ১ নম্বরে বলা হয়, “উক্ত কাজের ঠিকাদার কর্তৃক গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট বিভাগে বর্ণিত প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্যাদিসহ আর্থিক চিত্র উপস্থাপন করবেন।” বাকি দুটি দফা হুবহু একই রকমের। দুটি অফিস আদেশ একটি আরেকটির প্রতিস্থাপন কিনা, এ সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। দুটি অফিস আদেশই ইস্যু করা হয় ৩ মে, ২০২১ তারিখ দিয়ে। তবে গণপূর্ত অধিদফতরের সংস্থাপন শাখা-৩ থেকে ইস্যু করা আদেশটিতে প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষরে তারিখ দেয়া হয়েছে ২/৬/২০২১ইং, অন্যদিকে শাখা-১ থেকে ইস্যু করা আদেশটিতে প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর ৩/৫/২০২১ তারিখের। এটিকে গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘তুঘলকী কাণ্ড’ বলে আখ্যায়িত করছেন। দুটি কমিটিরই আহ্বায়ক, গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (স্বাস্থ্য উইং) মো. খাইরুল ইসলাম গত ২০ মে, শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে লেখা এক চিঠিতে বর্ণিত কাজের কাগজপত্র এবং ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রেরণ করার জন্য বলেন। অথচ এসব কাগজপত্র নির্বাহী প্রকৌশলী ইতিপূর্বে সবই পাঠিয়েছেন। খাইরুল ইসলাম এরপরে একই তাগাদা দিয়ে ২৫ মে এবং ৬ জুন আরো দুটি চিঠি লেখেন নির্বাহী প্রকৌশলীকে। যা বস্তুত সময়ক্ষেপণ এবং ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। মাঝে গত ৩০ মে, ২০২১ইং প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার একই বিষয়ে গণপূর্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সওস) ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দারের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি গঠনের চিঠিটি ইস্যু হয়েছে গণপূর্তের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে এবং এটিতেও স্বাক্ষর রয়েছে প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের। অথচ কোনো প্রতিষ্ঠানে একই সময়ে একই বিষয়ে একাধিক কমিটি গঠনের কোনো নজির অতীতে নেই এবং এটি বৈধও নয়। শেষ দিকে এসে এ সংক্রান্ত কাজে প্রথমে গঠন করা কমিটির আহ্বায়ক গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (স্বাস্থ্য উইং) মোঃ খাইরুল ইসলাম গত ১০ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চীফ একাউন্টস এন্ড ফিন্যান্স অফিসার এর উদ্দেশ্যে একটি মতামত প্রদান করেন। তাতে বলা হয়- শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে দেখা যায় জবঃবহঃরড়হ সড়হবু ( ধরে রাখা টাকা) বাবদ সংশ্লিষ্ট বিভাগে বর্ণিত প্রকল্পের ১৪৯.৭৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য প্রকল্পের জবঃবহঃরড়হ সড়হবু বাবদ ২০২২.০৬ লাখ টাকা সংরক্ষিত আছে। এমতাবস্থায়, বর্ণিত প্রকল্পে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধিত ১০৪৪.৯০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে প্রাপ্ত জবঃবহঃরড়হ সড়হবু সংক্রান্তÍ তথ্য ও অন্যান্য তথ্যাদির ভিত্তিতে উক্ত টাকা ফেরত আনার প্রায়োজনীয় নির্দেশনা/মতামত প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো। এছাড়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খাইরুল ইসলাম ১৪ জুন সেগুনবাগিচায় হিসাব মহা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে হিসাব মহা নিয়ন্ত্রক-কে একটি মতামত পেশ করেন। সেই মতামত পত্রে প্রকল্পের নানা বিষয় তুলে ধরে তিনি (মো. খাইরুল ইসলাম) প্রকল্পের ঠিকাদারকে অতিরিক্ত পরিশোধিত ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা/ মতামত প্রদানের জন্য অনুরোধ জানান। দুটি চিঠিতেই বলা হয় যে, নিউরো সায়েন্সের এই প্রকল্পে ‘রিটেনশন মানি’ অর্থাৎ সিকিউরিটির অর্থ জমা আছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এই ঠিকাদারের বাস্তবায়নাধীন সরকারের অন্যান্য প্রকল্পে সিকিউরিটি জমা আছে ২০ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার টাকা। জিকে শামীমকে অতিরিক্ত প্রদানকৃত ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ওই টাকা থেকে আদায় করার জন্য বলা হয়। বাস্তবে যা একেবারেই অসম্ভব। অভিজ্ঞজনরা বলছেন, মো. খাইরুল ইসলাম এর এই অনুরোধপত্র একেবারেই অর্থহীন। কারণ, পিপিআর অনুযায়ী কাজের প্রতিটি চুক্তি ও দায়বদ্ধতা আলাদা। সেখানে এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্প থেকে কেটে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া সেইসব প্রকল্পের ক্ষেত্রেও হয়তো দেখা যাবে, জিকে শামীম কাজের অতিরিক্ত টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন। এদিকে কমিটি প্রধান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলাম উপরোক্ত দু’টি মতামতের কোথায়ও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের শনাক্তের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্রে অতিরিক্ত কাজ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল প্রদানকারী প্রকৃত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শনাক্তকরণ বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো কথা উল্লেখ না করে বিষয়টি অত্যন্ত কৌশলে এড়িয়ে গেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খাইরুল ইসলাম। গণপূর্তের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর শেরেবাংলা নগর-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. ফজলুল হক (মধু)। সেখানে তিনি ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্ব পালনকালেই জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ ও পরপর দুটি বিল দেওয়া হয়। এ প্রকৌশলীর হাত ধরে শেরেবাংলা নগর ডিভিশনে জিকে শামীম নিটোর প্রকল্প, নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বর্ধিতাংশ নির্মাণসহ কয়েকশ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেন। জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর আলোচনায় আসেন প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু। শামীমের অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে প্রকৌশলী ফজলুল হকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু জিকে শামীমের ইস্যুটা কিছুটা আড়াল হওয়ার পর ফজলুল হক তার প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানাভাবে ম্যানেজ করতে সক্ষম হন। অপকর্ম চাপা দেয়ার পাশাপাশি ইতিমধ্যে একধাপ ওপরে অর্থাৎ নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি নেন তিনি এবং আকর্ষণীয় পদে পদায়নও বাগিয়ে নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ফজলুল হক মধুর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রোকন উদ্দিন, ঢাকা গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বসু এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সওস) ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার তাকে এসব ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা করেছেন। অথচ সরকারের বিধি-বিধান অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে এদের উচিত ছিলো এমন অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার শুরুতেই প্রকৌশলী ফজলুল হক মধুকে সাসপেন্ড করা এবং শোকজ করা। এরপর তদন্ত কমিটি গঠন, বিভাগীয় মামলা দায়ের করা অপরিহার্য ছিলো। এরা সেটি না করে বরং পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার কৌশল নিয়েছেন। এমনকি ফজলুল হককে শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি এবং আকর্ষণীয় পদায়নের ব্যবস্থা করেছেন।

মিডিয়ার অব্যহত চাপে মন্ত্রনালয়, এই ছাত্র লীগ ক্যাডার কে নামকা ওয়াস্তে বেতনের নিন্ম ধাপে অবনমনের যে শাস্তি দেয়া হয়েছে, তা সুশাসন প্রতিষ্টার পথে খুব জঘন্য একটা নজির হয়ে থাকলো। মাত্র এক বছরের মাথায় শাস্তি প্রতাহার হয়ে তিনি বাইজ্জত রেহাই পেয়েছেন। রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা সৎ কর্মকর্তাদের সামনে তিনি আবার সম্পদ আর ক্ষমতার উম্মত্ত আসফালন করবেন। রাষ্ট্রযন্ত্র তা কালো সান গ্লাস পড়ে দেখেও না দেখার ভান করবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর