প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের আকুল আবেদন: বাদ পড়া ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চাকরি জাতীয়করণের দাবি
স্টাফ রিপোর্টা:শহিদুল ইসলাম :
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে গ্রামের কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করে আসছেন জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষক। সরকারি স্বীকৃতি ও বেতন-ভাতার অপেক্ষায় থাকা এসব শিক্ষক এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ৫ হাজার বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক নেতাদের দাবি, এসব বিদ্যালয়ে সরকারি উপবৃত্তি ও মিড-ডে মিলের মতো সুবিধা না থাকায় দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। ফলে অনেক বিদ্যালয় কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের অধিকাংশই অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রিধারী। দীর্ঘদিন বিনা বেতনে শিক্ষকতা করতে গিয়ে অনেক শিক্ষক চাকরিরত অবস্থায় মারা গেছেন। আবার অনেকে কোনো ধরনের অবসরকালীন সুবিধা ছাড়াই অবসরে গেছেন। বছরের পর বছর শিক্ষকতা করার কারণে অনেকের সরকারি-বেসরকারি অন্য চাকরিতে যোগদানের বয়সও পার হয়ে গেছে।
২০১৭ সাল থেকে আন্দোলন:
শিক্ষক নেতারা জানান, বিদ্যালয় জাতীয়করণ ও বেতন-ভাতার দাবিতে ২০১৭ সাল থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে রাজপথে অবস্থান, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ও জলকামানের মুখে পড়ার অভিযোগও করেছেন শিক্ষকরা। এতে অনেক শিক্ষক আহত ও অসুস্থ হয়েছেন বলেও দাবি তাদের। শিক্ষকদের প্রশ্ন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করা মানুষকে কেন বেতন-ভাতার দাবিতে বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন করতে হবে?
জাতীয়করণ নিয়ে চিঠি ও কমিটি গঠনের দাবি:
শিক্ষক নেতাদের দাবি, ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়া ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয়করণ বিষয়ে একটি কনসালটেশন কমিটিও গঠন করা হয় বলে দাবি তাদের। তাদের আরও দাবি, জাতীয়করণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা, সচিব ও উপসচিবসহ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে স্বাক্ষরও করেছেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
বেতন না পেয়ে বিকল্প পেশায় শিক্ষকরা:
দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষক জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। তাদের কেউ টিউশনি করছেন, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন। আবার কেউ রাতের বেলায় পার্টটাইম নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন। অল্প আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেক শিক্ষক নিজেদের সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারছেন না। অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতেও তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার নামে ৫৩৪ বিদ্যালয়:
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির দাবি, জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়া ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৩৪টি বিদ্যালয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষক নেতাদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন প্রথা চালু হয়। কিন্তু বর্তমানে জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়া এসব বিদ্যালয়ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
নতুন শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্ন:
শিক্ষক নেতারা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮০ শিক্ষক বর্তমান সরকারের সময়ে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে যোগদান করবেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে শিশুদের পাঠদান করে আসা ৫ হাজার বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ কী হবে—এ প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করে আসা এসব শিক্ষকের বিষয়টিও মানবিক ও বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২০ হাজার শিক্ষকের আকুতি:
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল বলেন, একটি পরিবার পরিচালনা করতে মাসে অন্তত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ বছরের পর বছর শিক্ষকরা কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “৫ হাজার বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করে তাদের মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।” সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল আরও বলেন, শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে তাদের ন্যায্য অধিকার দাবি করে আসছেন। শিক্ষকদের বয়স, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বিনা বেতনে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হলে হাজার হাজার পরিবারের অনিশ্চয়তা দূর হবে। শিক্ষক নেতাদের আশা, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিনা বেতনে শিক্ষাদানের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল
যুগ্ম মহাসচিব
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কেন্দ্রীয় কমিটি), ঢাকা









