ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের ৬৬৬ কোটি টাকা কর আদায়ে হাইকোর্টের রায়
জিয়াউল হক টুটুল:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গ্রামীণ কল্যাণ ও এনবিআরের মধ্যকার করসংক্রান্ত আইনি বিরোধে নতুন মোড় এসেছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এনবিআরের দাবি করা আয়কর নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা আইনি চ্যালেঞ্জ আর বহাল থাকল না। আদালতের রায়ের পর প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারবে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। আদালতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। মামলার পটভূমিতে রয়েছে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ পর্যন্ত পাঁচটি করবর্ষের আয়কর। এসব করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে এনবিআর কর দাবি করে। পরবর্তীতে কর পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রদেয় করের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এনবিআরের এই কর দাবি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রুল জারি করেন। দীর্ঘ সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মামলাগুলো এগিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় মামলাটি নতুন হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য আসে। বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে আদালত রুল খারিজ করে দেন। ফলে এনবিআরের দাবি করা করের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা রিট আর টিকল না।
এই করসংক্রান্ত মামলায় এর আগে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়ে রায় দিয়েছিলেন। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৪ অক্টোবর ওই রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ ওই রায় প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। এরপর মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়। নতুন বেঞ্চে বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা ও শুনানির পর বৃহস্পতিবার রিট খারিজের সিদ্ধান্ত এলো। আদালতের বর্তমান রায়ের ফলে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির করা রিটের আইনি বাধা থাকল না। এনবিআরের দাবির আওতায় থাকা করবর্ষগুলো হলো—২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭। এসব করবর্ষের কর পুনর্মূল্যায়নের পর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে যে কর দাবি করা হয়েছিল, সেটিই আদালতের মামলার মূল বিষয় ছিল। ২০১৭ সালে ওই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি রিটের নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার আদালত এনবিআরের পক্ষে কর আদায়ের পথ উন্মুক্ত করে দিলেন।
গ্রামীণ কল্যাণের করসংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে আইনি প্রক্রিয়া চলছিল। প্রথমে রিট আবেদন, পরে রুল, এরপর পূর্বের রায় প্রত্যাহার এবং মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠানোর মধ্য দিয়ে বিষয়টি একাধিক ধাপ অতিক্রম করে। আগের রায় প্রত্যাহারের পর মামলাটি নতুন বেঞ্চে পুনর্বিবেচনার জন্য আসে। সেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনার পর বৃহস্পতিবার রিটগুলো খারিজ করা হয়। ফলে এখন এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা করের বিষয়ে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে করা ওই দুটি রিটের আর কোনো কার্যকারিতা থাকল না। আদালতের এ সিদ্ধান্তের পর আইন অনুযায়ী কর আদায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে এনবিআর। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই করসংক্রান্ত মামলায় বৃহস্পতিবারের রায় তাই গ্রামীণ কল্যাণ ও এনবিআর—উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।









