র‌্যাবের নাম বদলে পুরোনো বাহিনী নয়, এসআরবি বিল প্রত্যাহারের দাবি: বিরোধীদলীয় নেতা

সময়: 12:00 pm - September 10, 2026 |

জিয়াউল হক টুটুল:

র‌্যাব বিলুপ্ত করে একই জনবল, স্থাপনা, লজিস্টিক ও ক্ষমতার কাঠামো বহাল রেখে নতুন নামে আরেকটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণ র‌্যাবের বিলুপ্তি চেয়েছিল; শুধু নাম পরিবর্তন করে একই বাহিনী ফিরিয়ে আনার দাবি কেউ করেনি। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল-২০২৬’ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে প্রস্তাবিত বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা, কাঠামো ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনের বৈঠকে এসআরবি বিল নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের আওতাধীন বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন গঠনের লক্ষ্যে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত আইনে র‌্যাবের জনবল, সম্পদ ও নথিপত্রসহ বিভিন্ন বিষয় নতুন ইউনিটে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ বিলটি সাধারণ কোনো আইন নয়; জাতীয় জীবনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর বাহিনীটির কার্যক্রম নিয়ে দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি সুখকর নয়। বাহিনীটির কিছু ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও এর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি করেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, র‌্যাবের হাতে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এমন অনেক মানুষ বর্তমানে সংসদে রয়েছেন। তিনি নিজেও র‌্যাবের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন এবং কেউ কেউ গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। র‌্যাবের হাতে গুমের শিকার হয়ে পরে ফিরে আসা সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগমের স্বামীর ওপর নির্যাতন ও তাঁকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব ঘটনা এবং র‌্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই বাহিনীটি বিলুপ্তির দাবি জোরালো হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

এসআরবি বিলের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় র‌্যাবের সদস্য, স্থাপনা, লজিস্টিক ও ক্ষমতার কাঠামো অনেকটাই অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে নতুন নামে কার্যক্রম চালানো হলে প্রকৃত সংস্কার হবে না। তিনি বলেন, র‌্যাবের সদস্যরা থাকবেন, তাদের স্থাপনা ও লজিস্টিক থাকবে এবং ক্ষমতার কাঠামোও বহাল থাকবে—তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়? শুধু নাম বদলে নতুন নাম বসালে জনগণ সেটি গ্রহণ করবে না। সম্প্রতি পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নিতে যাওয়ার একটি ঘটনার কথাও সংসদে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই ঘটনায় কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লোকজন দ্রুত সেখানে না পৌঁছালে ওই নারীকে নিয়ে যাওয়া হতে পারত। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ওই নারী কোনো অপরাধ করেছেন কি না, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা প্রশ্ন তৈরি করে—অতীতে যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, তাদের শুধু এক বাহিনী থেকে অন্য বাহিনীতে স্থানান্তর করলেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিশ্চিত হবে কি না।

বিরোধীদলীয় নেতা জানান, তিনি এসআরবি বিলটি বিস্তারিত পড়েছেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বিলে কিছু পরিবর্তন ও নতুন কিছু বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হলেও মৌলিক বিষয়গুলোতে তেমন পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে জবাবদিহি এবং অভিযোগ তদন্তের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে একই প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার অপরাধ, আমি নিজেই তদন্ত করব’—এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নিয়ে নাগরিক সমাজের মধ্যেও উদ্বেগ ও আপত্তি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁর মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত আইন তাড়াহুড়ো করে চলতি অধিবেশনেই পাস করার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, প্রথমে স্পষ্ট করতে হবে কেন একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার জন্য এ ধরনের বাহিনী সত্যিই প্রয়োজন কি না, তার যৌক্তিকতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে বাহিনীর কাঠামো, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়গুলো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, র‌্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে তারা একমত। তবে একই ধরনের বাহিনীকে নতুন নামে প্রতিষ্ঠার আগে আরও চিন্তাভাবনা, বিস্তৃত আলোচনা এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগের কারণগুলো শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে দূর হবে না। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এসআরবি বিল এখনই পাস না করে সরকারকে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর প্রস্তাব, প্রয়োজনীয় সংস্কার, বিস্তৃত আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণের আস্থাভাজন কোনো বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের প্রয়োজন হলে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জনগণের অনুভূতি ও বাস্তব উদ্বেগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিলটি ফিরিয়ে নেওয়া হলে সেটি সরকারের একটি দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের উদাহরণ হয়ে থাকবে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর