গণপূর্তের ‘ডীপ স্টেট’ কি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী স্বপন চাকমা? দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সম্পদের উৎস

সময়: 12:15 pm - April 12, 2026 |

নিজস্ব প্রতিবেদক: তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী স্বপন চাকমা কি গণপূর্তের ডীপ স্টেট? দূর্ণীতি করে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েও সব সময় রয়ে গেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে।

২০১৯ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নয়জন প্রকৌশলী এবং দুই মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তাসহ ১১ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গ্রেপ্তার হওয়া ঠিকাদার জিকে শামীমের সঙ্গে যুক্ত থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। ৩০ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর চিঠি পাঠায় দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

যাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে, ৬ নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন চাকমা, মোহাম্মদ শওকত উল্লাহ, মোহাম্মদ ফজলুল হক, আব্দুর কাদের চৌধুরি, মো. আফসার উদ্দিন ও মো. ইলিয়াস আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মোমেন চৌধুরী ও মো. রোকন উদ্দিন এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রধান মুমিতুর রহমান এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে মমিতুর রহমান এক সময় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন (তথ্য সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো; ৩০/১০/২০১৯)। কেসিনো কান্ডে জিকে শামীম গ্রেফতার হলে তার সঙ্গে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে ফেসে যান ১২ জন প্রকৌশলী। ফলে তাদের সকল ব্যাংক একাউন্ট লেনদেনের তথ্য তলব করে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট। মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিষয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ। কারও অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হলে সে তথ্য খতিয়ে দেখে বিএফআইইউ। এছাড়া সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কারও তথ্য চাইলে বিএফআইইউর মাধ্যমে তার অ্যাকাউন্টের তথ্য চেয়ে থাকে (তথ্য সূত্রঃ সমকাল ২৭/১১/২০১৯)।

স্বপন চাকমার উত্থানঃ তিনি চাকুরি জীবনের শুরু থেকেই আওয়ামী পন্থী অফিসারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা আব্দুল কাদের চৌধুরী ছিলেন তার আদর্শিক গুরু। ফলে তিনি খুব সহজেই নগর গণপূর্ত বিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর পোস্টিং পেয়ে যান। কাদের চৌধুরী মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাকে এই পোস্টিং পাইয়ে দেন। সেখানে চাকুরীর সুবাদে আওয়ামীপন্থী একঝাক আমলার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেন। ফলে তাকে আর বেগ পেতে হয়নি। যদিও তিনি তখনও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা পাস করেন নি , কিন্তু সহকারী প্রকৌশলী হয়েও রমনা উপ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার দখল করে ছিলেন। এ নিয়ে ব্যপক সমালোচনা হলে এই ফেল্টু মাস্টারকে গাজীপুরে বদলী করা হয়। গাজীপুরে তিনি জমিজমার রিপোর্ট প্রদানে সক্রিয় সিন্ডিকেটের প্রিয় পাত্র ছিলেন। সেখানে তিনি ঠিকাদার-ভুমিদস্যু-আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান। দশ বারের চেষ্টায় পিএসসিকে ম্যানেজ করে এই আদু ভাই পেছন দরজা দিয়ে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা পাস করেন, তাও তার হাটুর বয়সী নাতি পুতিদের সঙ্গে।

নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে আজীবন ঢাকা ও গাজীপুরে পোস্টিংঃ এর পর পদোন্নতি পাওয়ামাত্র সিন্ডিকেট তাকে শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ নিয়ে আসে। সেখানে রোকনোদ্দিন প্রমোশন পেয়ে গেলে, সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এর আস্থাভাজন হিসাবে তাকেই পোস্টিং দেয়া হয়। মুজিব বর্ষ উদযাপনের নামে করোনা মহামারি ও মন্দা অর্থনীতির মধ্যেও ৩২০ কোটি টাকা তার হাত দিয়েই খরচ হয়েছে। সেখানে হাজার কোটি টাকা টেন্ডার বানিজ্য করে তিনি আবার গাজীপুরে বদলী হয়ে যান। গাজীপুরে তার লাগামছাড়া দূর্নীতির জন্য দুদক এ তদন্ত চলছে। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ প্রকল্পে স্থাপনা নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নে ৫৪২ কোটি ৮৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. মনিরুজ্জামান ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে বালু ভরাট না করেই ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সাড়ে ছয় কোটি ও ভেরিয়েশনের নামে গাজীপুর গণপূর্তের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন চাকমা হাতিয়ে নিয়েছেন শত কোটি টাকার বেশি। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই ফাটল ধরে অবকাঠামোগুলোয়। এ ছাড়া ২৭ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় কার্যাদেশ বাতিল, বিল পরিশোধ না করায় প্রকৌশলী স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে গাজীপুর যুগ্ম জজ প্রথম আদালতে মামলা করেন এস এইচ জয়েন্টভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মো. মোনায়েম কবির। তিন কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার টাকায় বালু ফেলে প্রথম পর্যায়ে ভূমি উন্নয়নের কাজ পেয়েছিলেন তিনি। ভূমি উন্নয়ন খাত থেকে ৬.৫ কোটি এবং কাশিমপুর কারাগারের পার্ট-২ ভেতরে আরসিসি সড়ক মেরামত না করে ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন তিনি স্বপনের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদকে লিখিত অভিযোগ দেয় জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি। অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ৩ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে (স্বাস্থ্য উইং) অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে দুদকও অনুসন্ধান শুরু করেছে। এসএইচ জয়েন্টভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মোনায়েম কবির বলেন, তিনি চূড়ান্ত বিল দাখিল করার পর স্বপন চাকমা তাঁর কাছে ২৭ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। তা দিতে না চাইলে ‘সময়মতো কাজ সম্পন্ন করা হয়নি’ কারণ দেখিয়ে তাঁর কার্যাদেশ বাতিল করেন। বাধ্য হয়ে মোনায়েম স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি গাজীপুর যুগ্ম জজ প্রথম আদালতে অর্থ আদায়ে মামলা করেন। সূত্র জানায়, দরপত্রে দ্বিতীয় পর্যায়ে ভূমি উন্নয়নকাজে বালু ভরাটের গড় গভীরতা ছিল ১৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। মাত্র তিন থেকে চার ফুট বালু ফেলে ভবন নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এতে ফিনিশড গ্রাউন্ড লেভেল (এফজিএল) নকশা অনুযায়ী হয়নি। কিন্তু ১২ ফুট বালু ভরাট দেখিয়ে ১২ কোটি টাকা বিল তুলে নেওয়া হয়। ওই বিল থেকে স্বপন চাকমা একাই নেন সাড়ে ছয় কোটি টাকা। বালু কম ফেলায় হাসপাতাল ভবনের চেয়ে একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, ডরমেটরি ভবন প্রায় ১০ ফুট নিচু হয়। তোপের মুখে পড়লে স্বপন তড়িঘড়ি হাসপাতাল থেকে একাডেমিক ভবনে যাতায়াতের করিডর নির্মাণ করেন। যে স্থানের ওপর দিয়ে করিডর নির্মাণ করা হয়েছে সেটি মূল নকশায় ছিল খেলার মাঠ। নাম না প্রকাশের শর্তে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষক বলেন, প্রতিটি ভবন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই ভবনগুলোর দেয়াল এবং ভেতরের সিসি সড়ক ও ড্রেনে ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে সিসি ঢালাই সড়ক ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ফাটল ঢাকতে সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।

বালু ভরাট না করে সাড়ে ছয় কোটি এবং কাশিমপুর কারাগার (পার্ট-২) অভ্যন্তরে আরসিসি রাস্তা মেরামতের ৬৫ লাখ টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগে স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করে গাজীপুর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি। অভিযোগ আমলে নিয়ে স্বপন চাকমার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বালু ভরাট না করে সাড়ে ছয় কোটি এবং গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে কাশিমপুর কারাগারের কাজ না করে রাস্তা মেরামতের ৬৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলাদা তদন্ত শুরু করেছে। স্বপনের নিজ শহর রাঙামাটিতে ছয়তলা আলিশান ভবন, ঢাকায় ফ্ল্যাট এবং গাজীপুর মহানগরীর নীলেরপাড়ায় কিনেছেন এক বিঘা জমি।
দুদকের গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা সাগর কুমার সাহা বলেন, স্বপন কুমার চাকমার দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান শেষ হলে প্রতিবেদন কমিশনে পাঠানো হবে।
এরপর তাঁকে শরীয়তপুরে বদলি করা হয়। কিন্তু অতিক্ষমতাধর প্রকৌশলী স্বপন চাকমা সেখানে যোগদান করেননি। রিজার্ভে বসে ছিলেন। এর পর তাকে রাঙ্গামাটি গণপূর্ত বিভাগে বদলী করা হলে সেখানেও যাননি। উল্টো একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দূতাবাস থেকে ফোন করিয়ে ঢাকায় থেকে যান। পরে সংস্থাপনে নির্বাহী প্রকৌশলী বনে যান।
সংস্থাপনে নিয়োগ ও বদলী বানিজ্যের অভিযোগঃ সংস্থাপনের নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতিপান ২০২৫ সালে। পদোন্নতি পেয়ে সমন্বয়ের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে বসেন। এই সময়ে মধ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যপক নিয়োগ ও তদবীর বানিজ্যের অভিযোগ আসে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে গণপূর্ত অধিদপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর প্রায় ৬৬৯ পদে নিয়োগে জনপ্রতি সতের লক্ষ টাকার লেনদেন হয়েছে তার একক নিয়ন্ত্রনে। নিয়োগের শেষের দিকে পদোন্নতি পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সমন্বয় হয়েও শেষ পর্যন্ত নিয়োগ বানিজ্য তার দখলে ছিল। আবার উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে গণহারে বদলীতেও তিনি ও কাজী ফিরোজ হাসান সিন্ডিকেট কলকাঠি নেড়েছেন। নিয়োগ বানিজ্য শেষ করে তিনি আবার চলে গেছেন সমন্বয়ে । মূলত এখান থেকেই মারামর ও রক্ষনাবেক্ষনের বাজেট চূড়ান্ত করা হয়। তাছাড়া থোক এর টাকা নিয়ন্ত্রন করেন তিনি। তাকে যারা ১০ পার্সেন্ট টাকা দেন তারাই থোক বরাদ্দে অগ্রাধিকার পান মর্মে জন শ্রুতি আছে। একথা সচেতন কোন নাগরিকের অজানা নয় সকল চাকমা দেরকে ভারত নাগরিকত্ব দিয়ে রেখেছে। সে হিসাবে স্বপন চাকমা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভারতীয় নাগরিক এবং তারা অবাধে ভারতে যাতায়াত করে অর্থপাচার করে থাকে।আওয়ামী ফাসিবাদের ১৫ বছর, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর, কিংবা নব নির্বাচিত বিএনপি সরকার তিনি আছেন সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে। টেণ্ডার বানিজ্য, নিয়োগ -বদলী বানিজ্য সব কিছুতেই তার কালো হাতের থাবা,অথচ তিনি থাকেন অধরা। অথচ বদরুল, সারোয়ার জাহান বিপ্লব এদের নামে ক্রমাগত প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে নিজে থাকছেন ধরাছোয়ার বাহিরে। স্বপন চাকমা নামে বেনামে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক মর্মে খোজ পাওয়া যায়। অবিলম্বে তার বিরুদ্ধে দুদকের অর্থ বহ তদন্ত দাবি করছি। নাকি আবারও অবৈধ অর্থ আর আমলা তান্ত্রিক কানেকশন কাজে লাগিয়ে তিনি পার পেয়ে যাবেন?

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর